জাপানী চলচিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়ার রসোমন ছবিটি হলো সেই সমাজের এমনই এক অপরাধের গল্প যেখানে কেউ সত্য বলে না। ১১ শতকের শহুরে জাপানের গল্পে রসোমন শহরের যে চিন্তার আত্মসর্বস্বতা তা যেন একুশ শতকের বাংলাদেশকে গ্রাস করেছে যেটাকে বলা যায় রসোমন ইফেক্ট। রসোমন ছবিটির চরিত্ররা কেউই যে সত্য বলে না এর কারণ তারা যে মিথ্যাবাদী বা মন্দ লোক সেটা নয়। তারা সত্য বলে না কারণ তারা প্রত্যেকে নিজেদের তৈরি যে বুদ্বুদের মধ্যে বাস করছে সেই জগতটাই কৃত্রিম বা বানানো বা মিথ্যা। নিজ নিজ ভাব, বড়াই বা ইগো ইনফ্লেশন ও ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজ নিজ চক্র আছে বর্তমান বাংলাদেশেও অনেক। যারা নিজেদের আবেগ আর লোভ লালসা আর তার সাথে ক্ষমতার মিশ্রণে এক একটি ফাঁপা ডক্টরিনের বুদ্বুদ তৈরি করে রেখেছে অনেকটা পীরতন্ত্রের মত। পীর যা ব্যাখ্যা দেন সেটাই ধর্ম সেখানে, সেই ব্যাখ্যার মধ্যে যুক্তি বা সমালোচনা খুঁজতে গেলে মুরীদরা সমালোচনাকারীকে পিটিয়েই মেরে ফেলবে। এদেশে এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেনানিবাস পর্যন্ত সবাই ফাঁপা ডক্টরিনের বুদ্বুদ।
কুরোসাওয়ার রসোমন ছবিটিতে প্রথমে দৃশ্যে বর্ষার দিনে ঝুম বৃষ্টিতে রসোমন শহরের প্রধান দুয়ারের ছাউনিতে বসে আছে এক কাঠুরে আর এক ধর্মযাজক। সেখনে এসে যোগ দিল এক ভবঘুরে। তারা তাকে কথাচ্ছলে বলল কি বিভৎস এক ঘটনা ঘটেছে এখানে তিনদিন আগে। বনে কাঠ কাটতে গিয়ে কাঠুরে দেখেছে এক সামুরাইকে যে মরে পড়ে আছে। সে বলে মৃতদেহ দেখে ভয়ে সে কতৃপক্ষকে খবর দেয়। ধর্মযাজকটি বলে খুনের দিনই সে দেখেছে এক সামুরাইকে তার স্ত্রী সহ বনের পথে যেতে। এই দুজনের ডাক পড়ে আদালতে এই খুনের সাক্ষী হিসাবে। সেখানে তারা পরিচিত হয় তোজোমারু নামে এক দস্যুর সাথে। তোজোমারু দাবী করে সে রশির বাঁধন থেকে মুক্ত করেছে ঐ সামুরাইকে।
দস্যু তোজোমারুর জবানবন্দী:
ভয়ংকর দস্যু তোজোমারু তার জবানবন্দীতে বলে লুকানো স্থানে আছে দামী এক তরবারী এই লোভ দেখিয়ে সে গাছের সাথে বেঁধে ফেলে সামুরাইকে। তখন সামুরাইয়ের স্ত্রীকে সে সেখানে নিয়ে আসে। যদিও সামুরাইয়ের স্ত্রী প্রথমে একটি দামি ড্যাগার উঁচিয়ে তাকে ভয় দেখিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে চায় কিন্তু তোজোমারুর পৌরুষে পরিশেষে সে মোহিত হয় ও নিজেকে সমর্পণ করে। এর পর সামুরাইয়ের স্ত্রী ভাবে দুটো পুরুষ তার লজ্জা দেখে ফেলেছে এটা তার জন্য মানহানীকর। সে অনুরোধ করে দুজনের মধ্যে ডুয়েল লড়তে। এই অনুরোধে তোজোমারু বীরের মত সামুরাইয়ের বাঁধন খুলে দেয় এবং লড়াইতে আহ্বান জানায়। যদিও তুমুল লড়াই হয় কিন্তু লড়াইতে সে জেতে। এমন সময় সামুরাইয়ের স্ত্রী দৌড়ে পালিয়ে যায়। আদালত তাকে প্রশ্ন করে দামী ড্যাগারটি কোথায়? সে বলে ঠিক মনে করতে পারছে না তবে সেটা ফেলে আসা তার বোকামি হয়েছে।
সামুরাইয়ের স্ত্রীর জবানবন্দী:
সামুরাইয়ের স্ত্রীর বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে বলে ডাকু তোজোমারু তাকে ধর্ষণ করে চলে যায়। সে তার স্বামীর কাছে করুণা ভিক্ষা করে যেন সে তাকে ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু তার স্বামী তার দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে থাকে। সে তখন তার স্বামীকে বন্ধন মুক্ত করে। তারপর ড্যাগার হাতে স্বামীকে অনুরোধ করে তাকে মেরে ফেলতে কারণ তার স্বামীর শীতল দৃষ্টি তার অসহ্য লাগে। কিন্তু তবুও তার স্বামী তার দিকে শীতল দৃষ্টিতে ঘৃণাভরে তাকিয়ে থাকে। তখন সে অজ্ঞান হয়ে যায় হাতে ড্যাগার নিয়েই। জ্ঞান ফিরলে সে দেখে তার স্বামী মৃত পড়ে আছে এবং ড্যাগারটা তার বুকে বিদ্ধ।
সামুরাইয়ের জবানবন্দী:
এক মাধ্যম দ্বারা প্ল্যানচেট করে সামুরাইয়ের আত্মাকে আদালতে ডাকা হয়। সামুরাই বলে তার স্ত্রীকে ধর্ষনের পর দস্যু তোজোমারু তার স্ত্রীকে তার সাথে যেতে অনুমতি দেয়। তার স্ত্রী সেটাতে রাজীও হয়, কিন্তু বলে দুইজন জীবিত পুরুষের ভোগ করা নারী হবার লজ্জা সে নিতে পারবে না। দস্যু তোজোমারুকে সে অনুরোধ করে তার স্বামীকে হত্যা করতে। এ কথায় বিস্মিত হয় দস্যু তোজোমারু। ক্ষিপ্ত হয়ে সে তার স্ত্রীকে ধরে ফেলে এবং সামুরাইকে বলে এখন তোমার সিদ্ধান্ত, ওকে মেরে ফেলতে পার বা চলে যেতে দিতে পার। সামুরাইয়ের আত্মা তখন আদালতকে বলে শুধু এই কথাটুকুর জন্য আমি দস্যু তোজোমারুকে ক্ষমা করে দেই। এরপর তার স্ত্রী পালিয়ে যায়। দস্যু তোজোমারু তার বাঁধন খুলে দেয়। এবং ড্যাগারটি দিয়ে সে আত্মহত্যা করে।
কাঠুরের বর্ণনা:
কাঠুরে বলে সে আসলে ধর্ষণ খুন সবই দেখেছে। উক্ত তিন জনই ডাহা মিথ্যা বলেছে। আদালতের ঝামেলা এড়াতে সে সব চেপে গেছে। ধর্ষণের পর দস্যু তোজোমারু আসলে সামুরাইয়ের স্ত্রীকে তাকে বিয়ে করতে অনেকে সেধেছে। কিন্তু সামুরাইয়ের স্ত্রী তার স্বামীর বাঁধন খুলে দেয়। আসলে দুজন পুরুষের কেউই ডুয়েল লড়তে চায় নি। সামুরাই বলে একজন নষ্ট নারীর জন্য লড়তে মোটেই রাজী নয় সে। সামুরাইয়ের স্ত্রী তাদের নানা কথা বলে লড়াইতে প্ররোচিত করতে থাকে। বলে কেমন পুরুষ তারা যে একজন নারীর জন্য ডুয়েল লড়েতে পারে না। বারবার উত্ত্যক্ত করাতে তারা উভয়ে শেষমেষ অনিচ্ছায় কম্পিত হস্তে তাদের তরবারী বের করে। তরবারী দেখার পর সামুরাইয়ের স্ত্রী নিজেই ভয় পেয়ে যায়। লড়াকু দুজনও হাস্যকর ভীতির মধ্যে একে অপরের দিকে অগ্রসর না হয়ে একে অপরের থেকে পালিয়ে বেড়ায়। একদমই তোজোমারু যা বলেছে লড়াই তেমনটা হয়নি। এরপর অনেকটা দুর্ঘটনাক্রমে সামুরাই আহত হয়। তার স্ত্রী এটা দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। সামুরাই প্রাণ ভিক্ষা করে কিন্তু তোজোমারু তাকে দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যেই খুন করে তরবারীটা নিয়ে পালিয়ে যায়।
রসোমন শহরের প্রধান দুয়ারের ছাউনিতে বসে যখন কাঠুরে তার বর্ণনাটি দিচ্ছিল তখনই একটি বাচ্চা কেঁদে ওঠে। তারা দেখে একটা পরিত্যাক্ত শিশু একটি ঝুড়িতে রাখা। শিশুটিকে দেখতে গিয়ে ভবঘুরেটি শিশুর সাথে থাকা পোশাক কিমানো ও যে পোঁটলাটি ছিল সেটা গায়েব করে ফেলে। এটি কাঠুরে দেখে ফেলে। সে এর জন্য ভৎসনা করে ভবঘুরেটিকে। ভবঘুরেটি বলে খুব তো আমাকে চোর বলা হচ্ছে, আমরা জানিনা যে কেন তুমি আদালতে স্বাক্ষী দাও নি কেন? ড্যাগারটা কে মেরে দিয়েছে? এই বলে রসোমন শহর ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হয় ভবঘুরেটি। সে বলে, এখানে সব মানুষ আত্মসর্বস্ব, এখানে সে থাকতে চায় না।
কোটা পরিবর্তনের আন্দোলন থেকে শুরু করে সেটা থেকে আরব স্প্রিং কায়দায় সরকার ফেলে দিল এমনই কিছু আত্মসর্বস্ব বুদ্বুদ গ্রপ। এর পর রাতারাতি রাষ্ট্র পরিবর্তন শুরু হয়ে গেল, ভেঙে ফেলা হল প্রশাসন যন্ত্র যার উদ্দেশ্য রাষ্ট্র বাংলাদেশকে দূর পরাশক্তির কলোনি বানানো যারা একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র তৈরি করে এই এলাকায় ভূরাজনৈতিক সুবিধা নেবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে রিয়ালিজম বা বাস্তববাদ বলে একটি দৃষ্টিকোন আছে। এটি হল রাজনীতির মত জটিল বিষয়ে নানা তত্ত্ব আদর্শ দর্শন বা দিয়ে ক্ষমতার প্রতিযোগিতার দিকে নজর দেওয়া। আগষ্টের ৫ তারিখের রেজিম চেঞ্জের দাবিদার যেন এক বাক্যে এমনই অনেকগুলো আত্মসর্বস্ব বুদ্বুদ গ্রপের সবাই। ঘটনটিকে সবাই নিজ নিজ বিপ্লব ভাবছে।
অন্তর্বর্তী রেজিম চলে গেলে দেশ কেমন হবে সেটার জন্য এক এক পীরতন্ত্রের এক এক পরিকল্পনা। ছাত্রদের মিলিট্যান্ট গ্রুপের পরিকল্পনা একইভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সরকার ফেলে দুই বাংলার মানচিত্র এক করে বখতিয়ারের ঘোড়া দাবড়ানো। এরা আহমদ ছফার বইগুলোই শুধু পড়েছে আর প্রচুর ওয়াজ শুনেছে বলে মনে হয়। সাধারণ ছাত্রদের দল এত রাজনীতি বোঝে না, তাদের মনে শুধু ঘৃণা যেটা আত্ম ঘৃণার প্রতিফলন। হতাশ ও অকর্মণ্য ও আনন্দ বিহিন মুখস্তবিদ্যার জগতে তাদের কোন বর্তমান নেই, আগের জীবন দোজখ, সামনে বেহেশত – এটাই জীবনের মডেল। ছাত্রদের আর এক দল সিআইএ-আইএসআই এজেন্ট চালিত হয়ে কিশোর গ্যাং নেটওয়ার্ক এবং জামাত বিএনপির সমর বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। আর এক অংশীদার সামরিক বাহিনীর কর্মকান্ড যেন শীতল যুদ্ধের সময়কার আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী দলের মত। বাইরে আইনসিদ্ধ আর ভেতরে তাদের মত ক্ষমতাশালী হতে পারে কে? তাদের সহায় ছাড়া প্রশাসন তছনছ করতে পারে কেউ?
রেজিম চেঞ্জ হলেই অন্তর্বর্তী সরকার আসবে, তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দেবে এই আশাতে যোগ দিয়েছিলেন যারা তাদের গুড়ে বালি। অতিবামেরা মনে করছেন বাম বিপ্লব তাদের পরিকল্পনাতেই হয়েছে, নতুন সাম্যবাদের সংবিধান লেখা কেবল বাকি। অতি ডান ইসলামি সন্ত্রাসী দলগুলো কেয়ারই করে না সরকার কে বা কিভাবে স্থায়ী হবে। তারা জানে এই 'বিপ্লব' যেই করুক এটা তাদেরই জন্য। এর মধ্যেই তাদের সাজাভোগী নেতারা অনেকেই মুক্ত। তারা সবার আগে দেশ গড়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে কোন দ্বিধা ছাড়াই। ক্ষমতার প্রতিযোগিতার দিকে নজর দিলে দেখা যায় যা কিছু এখন ঘটছে সেটা তাদের পক্ষে। প্রশাসন ভেঙে ফেলা, সর্ব স্থানে সন্ত্রাসী ইসলামে সমর্থন বা এতে আপত্তি নাই এমন লোক নিয়োগ হচ্ছে। কল কারখানা জ্বালাও পোড়াও করে ভীতির রাজ্য কায়েম চলছেই। এতে সবচেয়ে ভীত পত্রিকাগুলো, কারণ তাদের মালিকদের আছে বড় বড় সব কল কারখানা। রিয়ালিজম বা ক্ষমতার প্রতিযোগিতার দিকে নজর দিলে আইএসআই-সিআইএ এর পরিকল্পনাই ফুটে ওঠে যাদের কথা নয়, ক্ষমতা পরিস্ফুটিত। এর সাথে এই প্রজেক্টে অর্থলগ্নি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা কারা করেছে সেটা যোগ করলে আসল খেলোয়াড় কারা সেটা পরিস্কার হয়ে যায়। কিন্তু এই যজ্ঞের ফলে আমাদের আম জনতার কি হবে?