কেন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে রঙিন বিপ্লব করে দেশের নিকৃষ্টতম ও সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যক্তিদের বসিয়েছে? কেন নোবেল পুরস্কারের মত একটি সম্মানীয় বিষয়কে এই অপকর্মের সাথে যুক্ত করা হয়েছে? এর সাথে যে পুরো পশ্চিমা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক বিষয় জড়িত এবং পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির মত নিরাপত্তা জড়িত, এবং তার জন্য ভারত ও চীনকে দুর্বল করতে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়া প্রয়োজন সেটা আগেই বলেছি।
বাংলাদেশে রঙিন বিপ্লব হবার এবং পশ্চিমা বিশ্বের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা ক্ষমতায় বসার সাথে সাথেই বন্দর বিদেশীদের হাতে তুলে দেবার প্রয়োজন পড়ল কেন সেটাও লিখেছি। যেটা হল বন্দর নিয়ন্ত্রণ করে একটি দেশের অর্থনৈতিক তথ্য হাতে পাওয়া যায় এবং সেটা দিয়ে দেশটিকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয়া যায়। একবার বন্দর মার্কিন সমর্থিত কোম্পানীর হাতে গেলে সকল আমদানী রপ্তানী তথ্য মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের হাতে যাবে এবং তারা দেশটিকে সুক্ষ্ম ব্যবস্থাপনা বা মাইক্রোম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
বিবিসি একটি রিপোর্টে লিখেছে “এক মার্কিন কর্মকর্তা বললেন, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি ‘অনির্দিষ্টকাল’ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের ওপর থাকা বিধিনিষেধ ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি যুক্তরাষ্ট্র “অনির্দিষ্টকাল” নিয়ন্ত্রণ করবে। কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ধাপে ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রি শুরু হওয়ার কথা এবং সেই বিক্রির আয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে—যাতে ভেনেজুয়েলা সরকারের ওপর প্রভাব বজায় রাখা যায়। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, “ভেনেজুয়েলায় যে পরিবর্তনগুলো অবশ্যই ঘটতে হবে, সেগুলো এগিয়ে নিতে আমাদের এই তেল বিক্রির ওপর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ দরকার।”
“মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দেন—ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সর্বোচ্চ ৫ কোটি ব্যারেল তেল “হস্তান্তর” করবে এবং তা বাজারদরে বিক্রি করা হবে। হোয়াইট হাউস জানায়, বিক্রির অর্থ যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত হিসাবে জমা হবে। ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এই অর্থ নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং তা ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে। বুধবার হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানান, তেল বিপণন শুরু করতে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বিক্রি কার্যকর করতে প্রশাসন প্রধান ব্যাংক ও পণ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করছে।
পরে CNBC-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা কারও তেল চুরি করছি না।” তিনি জানান, তহবিলের প্রথম অগ্রাধিকার হবে দেশটির অর্থনীতি স্থিতিশীল করা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, লক্ষ্য হলো অর্থ এমনভাবে বিতরণ করা “যাতে ভেনেজুয়েলার জনগণ উপকৃত হয়—দুর্নীতি নয়, শাসকগোষ্ঠী নয়—এবং স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে আমাদের হাতে পর্যাপ্ত প্রভাব থাকে।”
তবে এই পরিকল্পনা ডেমোক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। কানেকটিকাটের সিনেটর ক্রিস মারফি একে “পাগলামি” বলে আখ্যা দেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “তারা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্ত্রের জোরে ভেনেজুয়েলার তেল দখল করে দেশটিকে মাইক্রোম্যানেজ করার কথা বলছে। এই পরিকল্পনার ব্যাপ্তি ও উন্মত্ততা সত্যিই বিস্ময়কর।””
এখন প্রশ্ন হল খুবই বিপজ্জনক এই “উন্মত্ত বিস্ময়কর” জবরদখল প্রক্রিয়ায় জড়িত হচ্ছে কেন ট্রাম্পের আমেরিকা যেটা একটি বিশ্বযুদ্ধ বাধাতে পারে? এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আটক করা শুরু করেছে ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে যেগুলোকে রক্ষা করতে রওয়ানা দিয়েছে রাশিয়ান নিউক্লিয়ার সাবমেরিন?
এটি বুঝতে হলে আপনাকে খনিজ তেল, মার্কিন ডলার ও বিশ্বযুদ্ধের সংযোগটি বুঝতে হবে।
আপনি যদি ভূমধ্যসাগরের গ্রিসের ল্যাকোনিয়ান উপসাগর, সিঙ্গাপুর প্রণালী এইসব জলপথের উপর নজর রাখেন, তাহলে একটি পরিচিত দৃশ্য আপনার নজরে পড়তে বাধ্য। দেখবেন মাঝ সমুদ্রে এক তৈলবাহী জাহাজ বা অয়েল ট্যাঙ্কার থেকে অন্য ট্যাঙ্কার (STS: Ship to Ship) তেল স্থানান্তরিত হচ্ছে। এটি অনেক সময় সাধারণ মনে হলেও,অনেক সময়ই সেটা নয় কারণ বিভিন্ন দেশের বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি নির্দিষ্ট সীমানা আছে। এর মধ্যে প্রবেশ করলে জাহাজটিকে বন্দর এলাকায় গণ্য করা হয় এবং জাহাজগুলোর তথ্য নেয়া হয়। যেমন কোন জাহাজ, কি আনছে, কোথা থেকে আনছে এইসব। কোন ট্যাংকার যদি এই তথ্য প্রদান এড়িয়ে যেতে চায় তখন সেগুলো পোর্ট সীমার বাইরে খোলা সমুদ্রে অপেক্ষা করে। সেই এলাকাটি হয়তো আন্তর্জাতিক জলসীমায় পড়ে, যেখানে নিয়মকানুন ততটা কঠোরভাবে প্রয়োগ হয় না। ফলে এটি একটি নিয়ন্ত্রণগত ধূসর অঞ্চল (regulatory grey zone) হয়ে ওঠে। আর এই ফাঁকটাই কাজে লাগায় "ছায়া নৌবহর" বা ডার্ক ফ্লিটগুলো যারা এমন কিছু বহন করে যেগুলো তারা প্রকাশ করতে চায় না।
সারা বিশ্বের তেল বাণিজ্য মূলত দুটি সমান্তরাল ব্যবস্থায় বিভক্ত। যার একটিকে বলা যায় পশ্চিমা পেট্রো ডলার ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার সম্পূর্ণ দখল যুক্তরাষ্ট্রের। এখানে তেল কোনো ট্যাঙ্কারে লোড হবে, কোনো বন্দরে আনলোড হবে, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ হবে অথবা ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা কী হবে সেসব কিছু যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত যদি সৌদি আরব থেকে তেল কেনে। ট্যাঙ্কারের ইনস্যুরেন্স না থাকলে অধিকাংশ বন্দরে এটি ঢোকার অনুমতি পাবে না। এই ইনস্যুরেন্সের প্রায় ৯০% হাতে রাখে বীমা ক্লাবগুলো, যা পশ্চিমা দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে। তাই যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তারা সুনিশ্চিত করে: ১. কোনো ট্যাঙ্কার যেন সেই তেল না বহন করে, ২. বহন করলেও যেন ইনস্যুরেন্স না পায়, ৩. তেল যেন কোনো বন্দরে নামতে না পারে, ৪. এবং তেল যেন কোনো পরিশোধনাগারে না পৌঁছায়।
তেল বাণিজ্যের দ্বিতীয় ব্যবস্থাটি হচ্ছে মূলত চীন-প্রভাবিত। চীন বিভিন্ন ছদ্মবেশী কোম্পানির (shell companies) তৈরি করে প্রচুর পুরনো ট্যাঙ্কার কিনে নিচ্ছে। এগুলো ইরান, রাশিয়া বা ভেনেজুয়েলা থেকে তেল নিয়ে বিভিন্ন ধূসর অঞ্চলে পৌঁছে। ট্যঙ্কারে জ্বালানি পরিবহনের এই সমুদ্র যাত্রায় তারা ট্র্যাকিং সিস্টেম (transponder বা AIS) বন্ধ করে রাখে, যাতে কেউ তাদের অনুসরণ করতে না পারে। সেই অঞ্চলগুলোয় আগে থেকে বৈধ লাইসেন্স এবং ইনস্যুরেন্স-যুক্ত ট্যাঙ্কার অপেক্ষমান থাকে। সেখানে নিষিদ্ধ তেলকে বৈধ তেলের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়, যেমন, ওমানি বা মালয়েশিয়ার তেলের সাথে। তারপর ভুয়া দলিলপত্র ব্যবহার করে দেখানো হয় যে সমস্ত তেলটাই ওমানের!
এরপর এই তেল প্রধানত চলে যায় চীনের পূর্বাঞ্চলে, শানডং প্রদেশে। সেখানে অজস্র মুক্ত জ্বালানি পরিশোধনাগার রয়েছে, যাদের ডাকা হয় টি পট রিফাইনারি। এখানকার মজার বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো একটি টি পট রিফাইনারিকে চিহ্নিত করে নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে চীনারা তখনই তার নাম, ঠিকানা এবং মালিকানা বদলে ফেলে।
এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ, কারণ: ১. ডলারের বিশ্বশাসন দুর্বল হচ্ছে, ২. তাদের নিষেধাজ্ঞা আর ফলপ্রসূ নয়। বিশ্বের তিনটি প্রধান নিষিদ্ধ তেল উৎপাদনকারী দেশ (ইরান, রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা) এই সিস্টেমে যুক্ত। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলা এবং মার্কিন জ্বালানি ব্যবসা নেটওয়ার্কের বাইরের আরো অনেক দেশের খনিজ তৈল ব্যবসাকে যে কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রণে আনতেই চাইছে। এটা আসলে পেট্রো ডলার বিশ্বযুদ্ধ। যেটাতে আমেরিকা জিততে পারবে না এবং না জিততে পারলেও তারা শেষ। তাই তারা এত মরিয়া। এটা ট্রাম্পের লোভ বা পাগলামি নয়।
© সিরাজুল হোসেন
