অপারেটর, অগ্নিনির্বাপক কর্মী, স্থানান্তরিত এবং বেঁচে যাওয়া মানুষদের গল্প — বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনায় আটকে পড়া মানুষদের কাহিনি

চেরনোবিলের ৪০ বছর পর: সেই রাত যখন সোভিয়েত পারমাণবিক স্বপ্ন বিস্ফোরিত হয়

২৮ এপ্রিল বাংলাদেশ তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট ১-এ রাশিয়ার রোসাটম স্টেট কর্পোরেশন নতুন পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে। রিয়্যাক্টর কোরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি লোড করা হবে। এরপর রিয়্যাক্টরটিকে সর্বনিম্ন নিয়ন্ত্রিত পাওয়ার লেভেলে আনা হবে, যার পরে এর পাওয়ার পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। পরবর্তী পর্যায় হবে পাওয়ার স্টার্ট-আপ, যখন এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হতে শুরু করবে।

রাশিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে সর্বাধুনিক VVER-1200 (Gen III+) রিয়্যাক্টর ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই পারমাণবিক চুল্লিগুলেতো সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় উভয় ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে যার ফলে বিদ্যুৎ না থাকলেও রিয়্যাক্টর নিরাপদ থাকবে। ঈশ্বরদীর পদ্মা নদীর তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পে দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

সেই পাকিস্তান আমলে রূপপুর প্রকল্পের পরিকল্পনা হলেও তার পর আর কাজ এগোয়নি। গত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পরিণত হতে যাচ্ছে ৩৩ তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০% পূরণ করবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে স্বাধীনতা ও উন্নয়নের সাথে সাথেই আসে দায়িত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। ২৮ এপ্রিল, যেদিন বাংলাদেশ পদ্মার পাড়ে রূপপুরে তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রথম চালু করেছে, তার ৪০ বছরে আগে একই মাসের ২৬শে এপ্রিল, ১৯৮৬ তারিখে এক ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়েনর ও বর্তমানের ইউক্রেনের প্রিপিয়াত নদীর তীরে ইউক্রেনের চেরনোবিল শহরের কাছে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে। ঐ দুর্ঘটনায় সরাসরি ৩১ জন লোক প্রান হারান। ৩ লক্ষ ৪০ হাজার জন লোক আক্রান্ত হন। এই পারমাণবিক দুর্ঘটনাকে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট পারমাণবিক চুল্লীর সংখ্যা ছিল ৪টি। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত ১টা ২৩ মিনিটে ইউক্রেন ও বেলারুশ সীমান্তে অবস্থিত পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির[১] চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লী থেকেই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়। দুর্ঘটনাটি মূলত ঘটেছিলো নিরাপদ শীতলীকরণের ওপর একটি পরীক্ষা চালানোর সময়। রাতের শিফটে দায়িত্বরত কর্মীরা ভুল করে পারমাণবিক চুল্লীটির টার্বাইনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শীতল জল প্রবাহিত করে। ফলে সেখানে বাষ্প কম উৎপাদিত হয়। এতে করে পারমাণবিক চুল্লীটি উত্তপ্ত হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। 

সেই চেরনোবিল নিয়ে রুশ লেখক, সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ ইয়েভজেনি নোরিন এর আরটি ডট কমে প্রকাশিত লেখাটির অনুবাদ:


------------

তেজস্ক্রিয় বিকিরণ পরিমাপের ডোজিমিটারগুলোর কাঁটা স্কেলের বাইরে চলে গিয়েছিল। বিস্ফোরণ থেকে উঠে আসা বিশাল ধোঁয়ার স্তম্ভ আকাশের এক কিলোমিটার উঁচুতে উঠে গিয়েছিল। টন টন পারমাণবিক জ্বালানি এবং গ্রাফাইট চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল সই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশেপাশে। চেরনোবিল এনপিপি’র হতভম্ব অপারেটররা শুধু ভয়ে সেগুলো তাকিয়ে দেখছিলেন — ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর বিকিরণ দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটছে। অথচ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও কেউ এমন বিপর্যয়ের কথা কল্পনাও করতে পারেনি।

একটি পারমাণবিক রূপকথা

সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক শক্তিতে অগ্রদূত ছিল। ১৯৫৪ সালে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রাশিয়ার কালুগার ওবনিনস্কে চালু হয়। নতুন নতুন কেন্দ্র দ্রুত গড়ে ওঠায় তখন সব দিকে উৎসাহের জোয়ার বয়ে যায়। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে, ব্যাপক নির্মাণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রিপিয়াত নদীর তীরে ইউক্রেনের চেরনোবিল শহরের কাছে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (এনপিপি) নির্মিত হয়। নদীর নামে নামকরণ করা একটি শহর দ্রুত গড়ে ওঠে কেন্দ্রকে ঘিরে। প্রিপিয়াত ছিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা একটি শহর, চারদিকে প্রকৃতি ঘেরা। এর জনসংখ্যা ছিল ৫০,০০০ — মূলত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মী এবং তাদের পরিবারদের নিয়ে।

কেন্দ্রটি নিজেই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প অর্জনের সমন্বয়ে গঠিত ছিল — যা সোভিয়েতউত্তর যুগের ইউটোপিয়ার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই সময় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল; পারমাণবিক শক্তিকে দেখা হতো অভূতপূর্ব পরিমাণ শক্তি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ, নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ উপায় হিসেবে।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, ১৭ নভেম্বর, ১৯৮৫, চেরনোবিল, ইউএসএসআর। © স্পুটনিক

দুর্ঘটনার সময় এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বড় ভূমিকা রেখেছিল। এলাকাটি ছিল অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল, আশেপাশে কোনো বড় শহর ছিল না — বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ প্রিপিয়াত শহরেই বাস করতেন। তবে দীর্ঘ প্রিপিয়াত নদী, এতে মিশে যাওয়া অসংখ্য ছোট নদী ও খাল এবং এলাকার ভেজা মাটি — এসব কারণে ভূগর্ভস্থ পানি বিকিরণযুক্ত কণাগুলোকে বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে পেরেছিল।

সেই সময়েও বোঝা গিয়েছিল যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ১৯৭৯ সালে আমেরিকার পেনসিলভানিয়ার থ্রি মাইল আইল্যান্ড পারমাণবিক কেন্দ্রে একটি গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটে। রিয়্যাক্টরের কোর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় ২ লাখ মানুষকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নিতে হয়। সৌভাগ্যবশত, কোনো প্রাণহানি হয়নি। থ্রি মাইল আইল্যান্ডের ঘটনাটি মূলত অর্থনৈতিক সমস্যায় পর্যবসিত হয়।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চারটি আরবিএমকে (RBMK) ধরনের রিয়্যাক্টর ছিল। সেখানে কী ঘটেছিল তা বুঝতে হলে এই রিয়্যাক্টরগুলো সম্পর্কে কিছু কথা বলা দরকার। রিয়্যাক্টরের কোর ছিল সাত মিটার বা প্রায় ২৩ ফুট উঁচু একটি সিলিন্ডার, যেটা ছিল পারমাণবিক জ্বালানি এবং গ্রাফাইটে ভর্তি। সেখানে সবসময় একটি স্থির পারমাণবিক বিক্রিয়া চলত, যা জ্বালানি রডগুলোকে উত্তপ্ত করত। বিশেষ সার্কুলেশন পাম্পের মাধ্যমে কোরে সবসময় পানি পাম্প করা হতো, যেখানে তা ফুটে বাষ্পে পরিণত হতো। এই বাষ্প টারবাইন চালিয়ে তাপীয় শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করত। ঠান্ডা পানি প্রবেশ করানো জ্বালানি রডগুলোকে অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকেও রক্ষা করত। জেনারেটরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বাষ্প কনডেন্সারে গিয়ে ঠান্ডা হয়ে আবার পানিতে পরিণত হতো এবং তারপর আবার কোরে পুনঃপ্রবাহিত হতো।

২১১টি নিয়ন্ত্রণ রড

নিউট্রন-শোষণকারী উপাদান দিয়ে তৈরি ২১১টি নিয়ন্ত্রণ রড রিয়্যাক্টরের পাওয়ার আউটপুট নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহার করা হতো। এই রডগুলো রিয়্যাক্টর কোরে বিশেষ চ্যানেলের মাধ্যমে ভেতরে ঢোকানো ও বের করা হতো। নিয়ন্ত্রণ রডগুলো যত গভীরে ঢোকানো হতো, রিয়্যাক্টরের পাওয়ার তত কমে যেত। সব রড পুরোপুরি ঢোকালে রিয়্যাক্টর বন্ধ হয়ে যেত; সব রড বের করে দিলে রিয়্যাক্টর অসংযমিতভাবে অতিরিক্ত শক্তি উৎপাদনে ত্বরান্বিত হতো। নিরাপত্তার কারণে সবসময় কমপক্ষে ৩০টি রড ভেতরে রাখা বাধ্যতামূলক ছিল। সব নিরাপত্তা নিয়ম মেনে চললে এই ব্যবস্থা বেশ নির্ভরযোগ্য ছিল।

আগুনের রাত

১৯৮৬ সালের ২৫ এপ্রিল, চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ নম্বর রিয়্যাক্টরে একটি পরীক্ষা নির্ধারিত ছিল। অপারেটররা পরিকল্পনা করেছিলেন যে, রিয়্যাক্টর কোরে পানি সরবরাহকারী পাম্পসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বন্ধ করে দেখবেন টারবাইন কতক্ষণ শুধুমাত্র জড়ত্বের (ইনার্শিয়া) বলে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে। উদ্দেশ্য ছিল, জরুরি বিদ্যুৎ উৎসে স্যুইচ করার জন্য অপারেটররা কত সময় পাবে তা হিসাব করা।

সমস্যা ছিল, এই পরীক্ষা চালাতে গিয়ে কেন্দ্রের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার বড় অংশ নিষ্ক্রিয় করতে হয়েছিল, এমনকি জরুরি শীতলীকরণ পাম্প ব্যবস্থাও।

২৬ এপ্রিল মধ্যরাতে শিফটে দায়িত্বে ছিলেন: শিফট সুপারভাইজার আলেকজান্ডার আকিমভ, রিয়্যাক্টর কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ার লিওনিদ টপটুনভ এবং পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার আনাতোলি ডায়াতলভ। অপারেটররা পরিকল্পনা করেছিলেন রাত ১টায় পরীক্ষা শুরু করবেন। রাত ১:৩০-এর ঠিক আগে প্রথম অপ্রত্যাশিত সমস্যা দেখা দেয়। স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় রিয়্যাক্টরের পাওয়ার মসৃণভাবে কমানো যায়নি। বরং এটি অনেক বেশি কমে যায়। এই হ্রাসের ফলে ক্ষয়জাত পদার্থ — জেনন ও আয়োডিন — থেকে ‘রিয়্যাক্টর পয়জনিং’ হয়, যা রিঅ্যাকটরের পাওয়ারকে স্বাভাবিক স্তরে ফিরিয়ে আনতে দেয়নি।

তখন অপারেটররা একটি প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নেন: তাঁরা রিয়্যাক্টরের পাওয়ার সীমিত করার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ রডগুলো বের করে ফেলেন। পাওয়ার স্থিতিশীল হওয়ার পর ডায়াতলভ পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যদিও আকিমভ ও টপটুনভের মনে ক্রমশ সন্দেহ বাড়ছিল। এর মধ্যে কেউই বুঝতে পারেননি যে পরিস্থিতি ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং জরুরি শীতলীকরণ ব্যবস্থা তৎক্ষণাৎ চালু করা উচিত ছিল।

রিয়্যাক্টরের ভেতর পানি ও বাষ্পের মাত্রা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে, কিন্তু কর্মীরা সেটি সামাল দেন। তবে জ্বালানি উৎপাদন ও রিয়্যাক্টর শীতলীকরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানি ব্যবস্থায় চাপের ক্ষণিক উত্থানও শুধু সতর্কবার্তা নয়, বড় ধরনের অ্যালার্ম সিগন্যাল ছিল। পাম্পগুলোর কার্যক্রম ক্রমেই ধীর হয়ে যেতে থাকে। রিয়্যাক্টরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, কিন্তু তখন রিয়্যাক্টর কোরে একটিও নিয়ন্ত্রণ রড আর অবশিষ্ট ছিল না। অপারেটররা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

সেই মুহূর্তে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতিমধ্যে মহাবিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল।

আজও কেউ সঠিকভাবে জানে না ২৬ এপ্রিল রাত ১:২৩ মিনিটের দিকে ঠিক কী ঘটেছিল। যা অনস্বীকার্য তা হলো — রিয়্যাক্টর কোর অসংযমিতভাবে অত্যধিক গরম হয়ে উঠেছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বুঝতে পেরে অপারেটররা সব নিয়ন্ত্রণ রড আবার ঢোকানোর চেষ্টা করেন, যা ছিল মূলত রিয়্যাক্টর বন্ধ করার চেষ্টা। সব রডগুলোই নামানো হয় কিন্তু মাত্র দুই মিটার (প্রয়োজনীয় সাত মিটারের মধ্যে) নামার পরই সেগুলো আটকে যায়, কারণ অতিরিক্ত তাপে রড ঢোকানোর চ্যানেলগুলো বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুর্ঘটনা মামলার আসামীরা (বাম থেকে ডানে): চেরনোবিল প্ল্যান্টের পরিচালক ভিক্টর ব্রুখানভ, উপ-প্রধান প্রকৌশলী আনাতোলি দিয়াতলভ, প্রধান প্রকৌশলী নিকোলাই ফোমিন, বিচার চলাকালীন।

আকিমভ দ্রুত কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে ছুটে যান এবং সার্ভো-ড্রাইভ মেকানিজম বন্ধ করে দেন, আশা করেছিলেন রডগুলো নিজের ওজনে কোরের ভেতর পড়ে যাবে। আর কিছুই করার ছিল না তাঁর — জরুরি শীতলীকরণে সাহায্য করতে পারত এমন সব ব্যবস্থাই আগেই অপারেটররা নিজেরাই ম্যানুয়ালি নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন।

একটি তত্ত্ব অনুসারে, এই সিদ্ধান্তটি ছিল কফিনে শেষ পেরেক। রডগুলোর গ্রাফাইট টিপস বিক্রিয়াকে ধীর করেনি; বরং ত্বরান্বিত করেছিল। এই প্রভাবকে রডের মূল অংশের তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করার কথা ছিল, কিন্তু একসঙ্গে ২১১টি গ্রাফাইট টিপ নামানোর ফলে চাপ দ্রুত বেড়ে যায়। যদিও এটি শুধু একটি তাত্বিক ব্যাখ্যা, তবে যাই হোক, রডগুলো অতিরিক্ত গরম ও বিকৃত চ্যানেলে আটকে যায়। একটি চেইন রিয়্যাকশন শুরু হয়।

চাপের আকস্মিক বৃদ্ধি (প্রতি সেকেন্ডে ১৫ অ্যাটমোস্ফিয়ার) পাম্পের ভালভগুলোকে জোরে বন্ধ করে দেয়, ফলে রিয়্যাক্টরে পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তারপর রিয়্যাক্টরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেতর থেকে ফেটে যায়। রিয়্যাক্টর কোরে বিভিন্ন ধরনের উত্তাল রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতে থাকে, যার ফলে মাত্র ১৮ সেকেন্ডের মধ্যে একটি মারাত্মক বিস্ফোরক মিশ্রণ তৈরি হয়।

এবং তারপর বিস্ফোরণটি ঘটে।

১৩০ টন ওজনের সেপারেটর ড্রামগুলো তাদের বেস থেকে উড়ে যায়, ৫০০ টন ওজনের রিয়্যাক্টরের ছাদ উড়ে যায়, এবং পারমাণবিক জ্বালানি বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাফাইট পুরো স্টেশনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই মুহূর্তে আকিমভ চিৎকার করে বলেন:

“এটা কী হলো? আমরা তো সবকিছু ঠিকমতো করেছিলাম!”

প্রায় ৫০ টন পারমাণবিক জ্বালানি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং আরও ৭০ টন স্টেশনের আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ বেরিয়ে এসেছিল তা দশটি হিরোশিমা বোমার সমান। এদিকে রিয়্যাক্টরের ভেতর ৮০০ টন গ্রাফাইট জ্বলতে থাকে। শিফটের একজন কর্মী ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং আরেকজন কয়েক ঘণ্টা পর মারা যান। রিয়্যাক্টরের কর্মীরা তাদের চারপাশের বিকিরণের মাত্রা শুধু অনুমান করতে পারছিলেন, কারণ ডোজিমিটারগুলো ‘অফ স্কেল’ দেখাচ্ছিল। দেশটি এক অভূতপূর্ব পারমাণবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় এবং হাজার হাজার মানুষ অকল্পনীয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে চলেছিল।

নরম বৃষ্টি আসবে

রাত ১:৩০ মিনিটে, চেরনোবিল ফায়ার ব্রিগেডের প্রধান মেজর লিওনিদ টেলিয়াতনিকভ হঠাৎ একটি ফোন কলের শব্দে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। কয়েক মিনিট পরেই ফায়ার ট্রাকগুলো পারমাণবিক কেন্দ্রের দিকে ছুটে যায়। অন্ধকারে ঠান্ডা নীল আলো জ্বলছিল — সেগুলো ছিল ৪ নম্বর রিয়্যাক্টরের জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপ। অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা তাদের সাধারণ পোশাকে স্টেশনের যা অবশিষ্ট ছিল তার ছাদে উঠে পড়েন। ঘন ধোঁয়ার মধ্যে কয়েক ডজন মিটার উঁচুতে কাজ করছিলেন তাঁরা। টেলিয়াতনিকভ নিজে দু’বার টারবাইন হল এবং রিয়্যাক্টর অংশের ছাদে উঠেছিলেন — জ্বলন্ত খাদের ৭০ মিটার উপরে।

দুর্ঘটনার পর চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভবনগুলোকে হেলিকপ্টার দ্বারা দূষণমুক্ত করা হচ্ছে। ৬ মে, ১৯৮৫, চেরনোবিল, ইউএসএসআর © স্পুটনিক/ইগর কস্টিন

অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন এবং তা ছড়িয়ে পড়া থেকে রক্ষা করেন। সৌভাগ্যবশত, পাশের রিয়্যাক্টরের শিফট সুপারভাইজার ইউরি বাগদাসারভ দ্রুত ও সিদ্ধান্তমূলকভাবে কাজ করেন। তিনি নিজের রিয়্যাক্টর বন্ধ করে দেন এবং তাঁর দলকে রেসপিরেটর পরতে ও পটাশিয়াম আয়োডাইড খেতে নির্দেশ দেন — যা অনেক জীবন বাঁচায়।

৩ নম্বর রিয়্যাক্টরের আগুন নেভানোর সময় ৪ নম্বর রিয়্যাক্টরে কাজ করা কর্মীরা তীব্র বিকিরণজনিত অসুস্থতায় ধরাশায়ী হতে শুরু করেন। প্রথম সাড়া দেওয়া এই ব্যক্তিদের শরীর প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। বিকিরণ অসুস্থতা ধীরে ধীরে এবং যন্ত্রণাদায়কভাবে মানুষকে মেরে ফেলে; টেলিয়াতনিকভের অনেক অধীনস্থ তিন সপ্তাহ পর মারা যান। প্রথম যাঁরা মারা যান তাঁদের মধ্যে ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের লেফটেন্যান্ট ভ্লাদিমির প্রাভিক এবং ভিক্টর কিবেনক — দু’জনেরই বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। চিকিৎসক বলেছিলেন: 

“তাদের নতুন শরীরের দরকার ছিল; তাদের পুরনো শরীরের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।”
মেজর টেলিয়াতনিকভ নিজে বিকিরণজনিত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৮ বছর পর মারা যান। স্টেশনের অন্যান্য কর্মীরাও মারাত্মক মাত্রায় বিকিরণের শিকার হয়েছিলেন। শিফট সুপারভাইজার আকিমভ এবং তাঁর সহকারী টপটুনভ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারা যান, আর ডায়াতলভ মারা যান কয়েক বছর পর।

২৭ এপ্রিল প্রিপিয়াত শহর এবং এর চারপাশের ৩০ কিলোমিটার এলাকা থেকে মানুষ স্থানান্তর শুরু হয়। মানুষদের সরিয়ে নিতে কর্তৃপক্ষ ১,২২৫টি বাস এবং ৩৬০টি ট্রাক জড়ো করে। সরকার নির্দেশ দেয় যে বাসিন্দারা তাদের জিনিসপত্র ফেলে যাবেন। তাদের জিনিসপত্র বিকিরণে দূষিত হয়ে গিয়েছিল এবং ১ লাখ মানুষকে তাদের মালপত্রসহ সরিয়ে নেওয়ার মতো যানবাহন ছিল না।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনা। ২৭শে এপ্রিল, ১৯৮৬, চেরনোবিল, ইউএসএসআর। © স্পুটনিক/ইগর কস্টিন

প্রথম কয়েকদিনের কঠিন নৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি ছিল পশু-পাখিদের পেছনে ফেলে যাওয়ার নির্দেশ। তাদের লোম বিকিরণ শোষণ করে ফেলেছিল, তাই তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক ছিল। পেছনে ফেলে যাওয়া কুকুরেরা বিড়ালদের আক্রমণ করতে শুরু করে এবং পরে মানুষদের আক্রমণের চেষ্টা করে। একটি বিশেষ দল পাঠানো হয় এই দুর্ভাগা প্রাণীদের শিকার করে গুলি করে মারার জন্য। লুটেরাদের ধরতে সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়।

কিছু বাসিন্দা স্থানান্তরের বিরোধিতা করেন। একজন ব্যক্তি দূষিত জিনিসপত্রে ভর্তি একটি গাড়ি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সেনাবাহিনী তাঁকে জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় এবং একটি সাঁজোয়া যান দিয়ে গাড়িটি ও তার ভেতরের সবকিছু পিষে ফেলে। প্রথমদিকে স্থানান্তরিতদের কেন্দ্র থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখান থেকে তারা ইউক্রেনের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন — অনেকে হেঁটে। সামরিক হেলিকপ্টারগুলো মাথার উপর দিয়ে উড়ছিল। এটাই ছিল প্রিপিয়াতের শেষ — স্বপ্নের শহরের সমাপ্তি এবং ভূতুড়ে শহর হিসেবে তার নতুন ইতিহাসের শুরু।

দুর্ঘটনা পরবর্তী পরিষ্কার অভিযানের জন্য সারা দেশ থেকে যন্ত্রপাতি জড়ো করা হয়। পরিষ্কারক দলের জন্য প্রয়োজন ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং যন্ত্র, মাটি খননের সরঞ্জাম এবং হেলিকপ্টার। হেলিকপ্টারগুলো এই বিপর্যয় মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আকাশ থেকে এনপিপির উপর নিউট্রন শোষণের জন্য বোরন কার্বাইড, তাপ শোষণের জন্য ডলোমাইট, বালি এবং কাদামাটির মিশ্রণ ছড়িয়ে দেওয়া হয় — যাতে তেজস্ক্রিয় কণা ছড়িয়ে না পড়ে। হেলিকপ্টারগুলো স্থানান্তরিত শরণার্থীদের কলামের উপর দিয়েও উড়ছিল।
প্রথমদিকে হেলিকপ্টারগুলো সরাসরি এনপিপির উপরে ঘুরে ঘুরে মালপত্র ফেলছিল। কিন্তু পাইলটরা মারাত্মক বিকিরণের মাত্রায় আক্রান্ত হওয়ায় পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, থামা ছাড়াই দ্রুত মাল ফেলে দিতে হবে।

মাটিতে পরিষ্কার কাজ চলতে থাকে। প্রথমে স্বেচ্ছাসেবকরা দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে হাজির হয়েছিলেন, কিন্তু বেশিরভাগ কাজ করেছিল সেনারা। শুধুমাত্র প্রাথমিক সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে তারা বিপুল শ্রম দিয়েছিলেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া রিয়্যাক্টরকে কংক্রিটের সারকোফ্যাগাসের নিচে আবদ্ধ করা, নদীর জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করা, প্রিপিয়াত ও আশেপাশের এলাকা পরিষ্কার করা — এসব কাজ করতে হয়েছিল। এছাড়া এনপিপিকে ভূগর্ভস্থভাবে বিচ্ছিন্ন করা দরকার ছিল, যাতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ মাটিতে না ছড়ায় এবং প্রিপিয়াত ও ডনিপার নদীতে দূষণ না ঘটে।

কেন্দ্রের আশেপাশে কাজ করা মানুষেরা উচ্চমাত্রায় বিকিরণ পেতে থাকেন এবং পরিষ্কার অভিযানে দুর্ঘটনাও ঘটে। তবে সাত মাসের মধ্যে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়। বিষাক্ত পদার্থগুলো তুলনামূলকভাবে বড় কিন্তু কম জনবহুল এলাকার বাইরে আর ছড়াতে পারেনি। ২০৬ দিনের মধ্যে ৪ নম্বর রিয়্যাক্টরের উপর “শেল্টার অবজেক্ট” নামে পরিচিত কংক্রিট সারকোফ্যাগাস নির্মাণ সম্পন্ন হয়। অন্য রিয়্যাক্টরগুলোও পরিষ্কার করা হয়। রিয়্যাক্টরের চারপাশে কংক্রিটের দেওয়াল তৈরি করা হয়, তারপর ১২ মিটার উঁচু ক্যাসকেড দেওয়াল। কংক্রিট দেওয়ালের পাশাপাশি বায়ু চলাচল ব্যবস্থা এবং বিস্তারিত মনিটরিং সিস্টেম বসানো হয়। নির্মাণকাজের সময় আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে — একটি হেলিকপ্টার ক্রেনের তারে আটকে বিধ্বস্ত হয় এবং ক্রু সদস্যরা মারা যান। অবশেষে কাজ শেষ হয় এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া রিয়্যাক্টর সারকোফ্যাগাসের ভেতর আবদ্ধ হয়।

চেরনোবিল নিষিদ্ধ এলাকা থেকে প্রায় সব মানুষ চলে গেলেও এটি কখনো পুরোপুরি জনশূন্য হয়নি। মানুষের অনুপস্থিতিতে বন্যপ্রাণীরা ব্যাপকভাবে বেড়ে ওঠে। স্থানান্তরের প্রথম বছরে প্রিপিয়াতের আশেপাশে ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে যায় কারণ তারা পরিত্যক্ত শস্যক্ষেত্রের শস্য খেয়ে বেঁচে ছিল। রিয়্যাক্টরের কুলিং পন্ডে বিশাল আকারের ক্যাটফিশের বাসা হয়। জোনের ভেতর বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য ছোট একটি গবেষণা কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়। সেখানে বিভিন্ন প্রাণী আনা হয়, এমনকি এমন কিছু প্রজাতিও যারা আগে এ অঞ্চলে কখনো বাস করেনি। বনে বুনো শুয়োর, এল্ক এবং হরিণের সংখ্যা বেড়ে যায়।

এক অর্থে চেরনোবিল জোন একটি অভয়ারণ্যে পরিণত হয় — যেখানে লিংক্স, ভাল্লুক এবং এমনকি প্রজেওয়ালস্কির ঘোড়াও দেখা যায়, যাদের পরীক্ষামূলকভাবে সেখানে আনা হয়েছিল। কিছুদিনের জন্য জোনে অবশিষ্ট কয়েকজন মানুষ এবং প্রাণীরা নেকড়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধিতে সমস্যায় পড়েছিল। তবে রেঞ্জাররা দ্রুত তাদের সংখ্যা কমিয়ে দেন। যদিও একটি ভয়ংকর স্মৃতি রেখে দেন — একটি নেকড়ের মাথা, চোয়াল হাঁ করে খোলা, রেঞ্জারের গাড়ির রেডিয়েটরে বসিয়ে রাখা হয়। মজার বিষয় হলো, ঘোড়াগুলো নেকড়ে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেছিল — রেঞ্জাররা প্রায়ই দেখতেন ঘোড়ার দল তাদের শিকারিদের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। একদল বুনো কুকুরও এলাকায় বসতি স্থাপন করে। প্রথমদিকে তারা কাছাকাছি গবেষণা কেন্দ্রের সীমানা পাহারা দিত, কিন্তু পরে বন্য জীবনে অভ্যস্ত হয়ে শিকার করে এবং পরিত্যক্ত কেন্দ্রের টেকনোলজিক্যাল চ্যানেলে মাছ ধরেও খেত।

ইউক্রেনের চেরনোবিলের কাছে, ২০১৭ সালের ১৮ই আগস্ট, চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি পরিত্যক্ত, আংশিকভাবে নির্মিত কুলিং টাওয়ারের পাশে পথকুকুর। © শন গ্যালাপ/গেটি ইমেজেস

আনুষ্ঠানিকভাবে শুধুমাত্র নিষিদ্ধ এলাকার কর্মীরাই সেখানে থেকে গিয়েছিলেন। তবে কিছু মানুষ, যাদের ‘সামোসেলি’ (স্ব-বসতি স্থাপনকারী) বলা হয়, আশেপাশের বনে বসতি গড়ে তোলেন। এরা মূলত বয়স্ক বাসিন্দা, যারা নিজেদের বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। ৭০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ জন স্থানান্তরিতের মধ্যে প্রায় ১,২০০ জন তাদের পুরনো বাড়িতে ফিরে যান। তাঁরা সবচেয়ে বেশি দূষিত এলাকাগুলো এড়িয়ে চলতে পেরেছিলেন এবং বিকিরণের কারণে মারা যাননি। পুলিশের তাদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়, কারণ তাঁরা জেদের সঙ্গে বারবার ফিরে আসতেন।

এদের অধিকাংশই নিজেদের খাবারের জন্য চাষাবাদ করেন। তাঁরা এলাকাটি চিনে নিয়েছিলেন এবং কম দূষিত স্থানগুলো চিহ্নিত করে চলাফেরা করতেন। খুবই দরিদ্র অবস্থায় থাকায় এবং নিকটবর্তী জনবসতিপূর্ণ শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে থাকায়, তাঁরা পরিত্যক্ত চেরনোবিল ও প্রিপিয়াত শহর থেকে বিল্ডিংয়ের উপকরণ সংগ্রহ করতেন। কেউ কেউ পরিত্যক্ত শহরেই বসতি গড়েন, কিন্তু অধিকাংশই আশেপাশের বনে কুঁড়েঘর বানিয়ে থাকেন। সামোসেলিদের বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষ।

এলাকাটি পুলিশ পাহারা দেয়, এমনকি ঘোড়ায় চড়ে টহল দেয়। তারা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ পর্যটকদের ধরে। তবে তারা শুধু ‘স্টকার’দের খুঁজে বেড়ায় না। শিকারি, স্ক্র্যাপ মেটাল চোর এবং পালিয়ে আসা অপরাধীরা অনেক বেশি বিপজ্জনক। খুনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এছাড়া শিকারিরা এবং সামোসেলিরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে শিকার করে এবং ফাঁদ পেতে। এলাকায় উল্লেখযোগ্য তেজস্ক্রিয় দূষণের অঞ্চলও রয়েছে। জোনের সব অংশ সমান বিপজ্জনক নয়, কিন্তু এলাকা সম্পর্কে না জেনে ঘুরে বেড়ালে স্বাস্থ্যের উপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর সরকার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করে। কর্মীদের সিদ্ধান্ত, রিয়্যাক্টরের নকশা এবং ২৬ এপ্রিলের সেই ভয়াল রাতের ঘটনা — সবকিছু আনুষ্ঠানিক তদন্ত এবং অসংখ্য অনানুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে দুর্ঘটনার জন্য প্রায় ১০০% দোষ মানুষের ভুলের উপর চাপানো হয়।

চেরনোবিল এনপিপির পরিচালক ভিক্টর ব্রিউখানভ, আনাতোলি ডায়াতলভ, প্রধান প্রকৌশলী ভিক্টর ফোমিনসহ আরও কয়েকজনকে দুর্ঘটনায় তাদের ভূমিকার জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। যদিও কেউ পুরো সাজা ভোগ করেননি, ঘটনার মানসিক প্রভাব তাঁদের সারাজীবন তাড়া করে। ডায়াতলভ বাকি জীবন চেষ্টা করেছেন তাঁর কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে এবং সেই রাতে কী ভুল হয়েছিল তা বোঝার। অন্যদিকে ফোমিন শেষ পর্যন্ত মানসিক হাসপাতালে চলে যান।

তবে পরবর্তী তদন্তগুলো ঘটনার বর্ণনাকে অনেকখানি বদলে দেয়। অপারেটরদের অনেক সিদ্ধান্ত, যা প্রথমে অপরাধমূলক বলে বিবেচিত হয়েছিল, পরে দেখা যায় সেগুলো প্রোটোকল অনুসারেই নেওয়া হয়েছিল। এই বিপর্যয় থেকে মানবজাতি অনেক শিক্ষা নেয় — বিকিরণ নিরাপত্তা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা, প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা মোকাবিলা এবং বিকিরণজনিত অসুস্থতার চিকিৎসা পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসে। তবে এই শিক্ষা অত্যন্ত দুঃখজনক মূল্যে অর্জিত হয়।

চেরনোবিল দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক ফলাফলে ৩০ জনেরও কম সরাসরি মৃত্যু ঘটে, কিন্তু বিকিরণের প্রভাব কয়েক দশক ধরে চলতে থাকে। পরিসংখ্যান অনুসারে, পরিষ্কারকর্মী এবং স্থানান্তরিতদের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ২০% বেশি ছিল। এর ফলে কয়েক হাজার থেকে দশ বিশ হাজার বা অর্ধ লক্ষ বা তার কাছাকাছি মানুষ বিকিরণজনিত অসুস্থতায় মারা যেতে পারেন। সমস্যা হলো একটি নিরপেক্ষ পরিসংখ্যান; অনেক সময় বোঝা যেত না যে কোনো পরিষ্কারকর্মী স্বাভাবিক কারণে না বিকিরণের ফলে মারা গেছেন। তবে এটা নিঃসন্দেহে সত্য যে চেরনোবিল দুর্ঘটনা অসংখ্য জীবন কেড়ে নিয়েছে অথবা ধ্বংস করে দিয়েছে।

নিষিদ্ধ এলাকা চেরনোবিল এখন চরমপন্থী পর্যটকদের আকর্ষণের জায়গায় পরিণত হয়েছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকা প্রিপিয়াতের ধ্বংসস্তূপ, পুরনো সোভিয়েত রাডার ব্যবস্থা এবং পরিত্যক্ত তেজস্ক্রিয় যানবাহন ভ্রমণকারীদের টানে। তবে প্রকৃতি এবং সময় এই সোভিয়েত সভ্যতার শেষ চিহ্নগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। দুঃখের বিষয়, রাশিয়ার সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে ইউক্রেনে ধ্বংসস্তূপ এবং পরিত্যক্ত শহরের সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২০২২ সালে নিষিদ্ধ এলাকা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রুশ ও ইউক্রেনীয় বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সৌভাগ্যবশত, উভয় পক্ষই পুরনো রিয়্যাক্টরের কাছে দীর্ঘ ও তীব্র যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পেরেছে… কিন্তু পুরনো ধ্বংসস্তূপ ছেড়ে সেনাবাহিনী নতুন ধ্বংসস্তূপের দিকে এগিয়ে গেছে।

* লেখক ইয়েভজেনি নোরিন রুশ সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ, যিনি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধ ও সংঘাত নিয়ে লেখালেখি করেন।