বৃহত্তম শ্রেণীর জ্বালানী কোম্পানী এক্সনমোবিলের সিইও ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ব্যবসাকে 'অসম্ভব' বলে ঘোষণা করলেন ট্রাম্পের সাথে হোয়াইট হাউসের উত্তপ্ত সভায়। যেটি হয়ে উঠবে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তেল পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় বড় বাধা। নিজে নিজেকে মহান ও অতি ক্ষমতাশালী বলে মনে করলেই কি তার ইচ্ছায় ব্যবসা হয়?
গত ৯ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে উচ্চ পর্যায়ের এক সভায়, এক্সনমোবিলের সিইও ড্যারেন উডস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে বর্তমান অবস্থায় ভেনেজুয়েলায় গিয়ে তেল ব্যবসা 'অসম্ভবের' পর্যায়ে রয়েছে, যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে দেশটির ধ্বংসপ্রাপ্ত তেল শিল্প পুনরুদ্ধারে কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর এক অভিযানে নিকোলাস মাদুরোর অপহরণের পর, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক্সনমোবিল, শেভরন এবং কনোকোফিলিপসের মতো বড় মার্কিন শক্তি কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ব্যাপক পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ভেনেজুয়েলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুদ ধারণ করে। তবে উডস, ভেনেজুয়েলায় এক্সনমোবিলের দীর্ঘ এবং কঠিন অতীত ইতিহাস উল্লেখ করে, যেমন হুগো চাভেজের যুগে দুবার সম্পদ দখলের উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন যে গভীর কাঠামোগত যেমন ব্যবসা পরিবেশ ও আইনগত সংস্কার না হলে সেখানে কোনো গুরুতর বিনিয়োগ সম্ভব নয়।
সভায় থাকা সূত্রগুলোর মতে, উডস ভেনেজুয়েলার আইন ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক পরিবেশ, হাইড্রোকার্বন আইন এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ সুরক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়েছেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সহায়তায় এমন সংস্কার সম্ভব হতে পারে বলে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করলেও কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি, এবং জানিয়েছেন যে বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা গ্যারান্টি স্থাপিত হলে এক্সনমোবিল শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন দল পাঠানোর বিষয় বিবেচনা করবে। অন্যান্য বড় শক্তি কোম্পানিগুলোও অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা অব্যাহত রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করে। বিপরীতে, ছোট তেল কোম্পানিগুলো আরও খোলামেলা মনে হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে উচ্চ-ঝুঁকি, উচ্চ-পুরস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখছে।
এই বাস্তবতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শক্তি আধিপত্য কৌশলের সামনে উল্লেখযোগ্য বাধাকে তুলে ধরে। গত দশকে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ব্যবস্থাপনার অভাব, নিষেধাজ্ঞা এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, যা এই মুহূর্তটি সত্যিকারের পরিবর্তনের সুযোগ কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই বাস্তবতা নতুন নয়। পৃথিবীর বহু অনুন্নত দেশে মার্কিন সরকার পরিবর্তন বা রঙিন বিপ্লবের পর মার্কিন ব্যবসা প্রসারের স্বপ্ন দেখিয়ে ঘটানো হয়। কিন্তু প্রতিটি ব্যবসা একটি ব্যবসা পরিবেশ বা ইকোসিস্টেম দাবী করে যেটা তার প্রাতিষ্ঠিনক সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশের আইন, ক্রেতাদের আচরণ, ঝুঁকি এবং ব্যবসা পরিচালনা খরচ সব একসাথে মিলে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করে যেটা কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কোন নির্বোধ প্রসিডেন্টের ইচ্ছা দিয়ে পরিবর্তন করা যায় না। মিয়ানমারে নোবেল শান্তি পুরস্কার সরকার বসিয়ে এমন প্রচেষ্টা হয়েছে যেটা কাজ করেনি। বাংলাদেশে মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানী ব্যবসা দিয়ে এর মধ্যেই গ্যাস সংকটে দেশ।
তবে এক্সনমোবিলের সিইও ড্যারেন উডস ও অন্যান্য জ্বালানী ব্যবসায়ীর প্রতিক্রিয়া থেকে আমাদের পূর্বের ধারণা যে সত্য তারই আভাস মেলে। সেটা হল ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে নিজে ব্যবসা করা নয়, সেটা যেন চীন রাশিয়া ব্যবহার করতে না পারে সেটাই আসল লক্ষ্য।
© সিরাজুল হোসেন