বঙ্গবন্ধু জানতেন ফারুক রশিদ ডালিম যে তাঁর শত্রু তার কথা। তিনি জানতেন মিশর থেকে পাওয়া ট্যাংক যে তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে তার কথা। বঙ্গবন্ধু জানতেন জাকার্তা মেথডের কথা। তিনি জানতেন ইন্দোনেশিয়াতে সিআইএ এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহায়তায় সেখানকার মোল্লা মিলিটারি চক্রান্তে ১০ লক্ষ সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নেতা–কর্মীদের হত্যা করার কথা।
তাঁকে যখন সাবধান করা হয়, তাঁকে হত্যা করার চক্রান্তের বিষয়ে, তখন তিনি তাই বলেছিলেন—তার কন্যা যা বলেছেন। শেখ হাসিনা যেমন বলেছেন যে ক্ষমতা ছেড়ে তিনি গোপালগঞ্জে চলে যেতে চান, নিজের হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা শুনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলে আমি চলে যাব। গলায় চাদরটা জড়িয়ে আমি মানুষের সাথে মিশে যাব। তাদের সাথে নিয়ে আবার ফিরে আসব।
জাকার্ত মেথডের ভয়াবহতার চিন্তাতেও তখন তিনি নিজের কথা না ভেবে ভেবেছিলেন বাংলাদেশের বামপন্থী নেতাদের কথা। বলেছিলেন তাদের সাবধানে থাকবার কথা। উল্লেখ্য যে জাকার্তা মেথডে তখনকার ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং নেদারল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য সংগঠিত সফল সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী সুকর্ণকে হত্যা করা হয়নি।
কিন্তু তখনকার বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানের শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং ভারতের নিরাপত্তা পরামর্শকদের চোখ যে বিষয়টা ধরতে পারেনি, সেটা হল পাকিস্তানের আমেরিকার সাথে এম্বেডেড বা ছদ্মবেশী পরিকল্পনা। সবাই পাকিস্তান এবং আমেরিকার বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া পরিকল্পনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখেছে। অথচ পাকিস্তান এবং জামাত–শিবির–বিএনপি আমেরিকার লক্ষ্যকে ম্যানিপুলেট করে নিজেদের লক্ষ্য হাসিল করার চেষ্টা করছে ।
জাকার্তা মেথড হল আমেরিকার অস্ত্র সমাজতন্ত্র উচ্ছেদ করতে। যেটা হল গণমাধ্যম ব্যবহার করে এবং এলিট সমাজের মাধ্যমে ক্রমাগত ঘৃণা ছড়িয়ে যাওয়া। এর পর সেনা ক্যু করে নেতাদের হত্যা বা ক্ষমতাচ্যুত করে সেই ঘৃণার জন্য প্রতিশোধের লক্ষ্যে একটি দাঙ্গা বা গৃহযুদ্ধ সূচনা করা। এর পর সেই গৃহযুদ্ধের দায়ে বিচারিক এবং জেল–হত্যা করে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে সমূলে বিনাশ করা।
১৯৭৫ সালে সেটাই পরিকল্পিত লক্ষ্য ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সেনা অর্ডার ভেঙে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ করে যুদ্ধ লাগানো, যেটা গৃহযুদ্ধে পরিণত হলে তার পর সেই গৃহযুদ্ধে নিহতদের বিচারের নামে লক্ষ লক্ষ নেতা–কর্মী হত্যা করে দেশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু ও ভারতকে বন্ধু মনে করে এমন মানুষদের বিলুপ্ত করা। তখন ভারতের হস্তক্ষেপে, অর্থাৎ বাংলাদেশের মৌলিক সাংবিধানিক পরিবর্ত করা হলে ভারত বাংলাদেশে সেনা অভিযান পরিচালনা করবে—এই হুমকিতে সেই অবস্থা থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পায়।
২০০৭–৮ এর এক–এগারোর সামরিক সরকারের সময় পরিকল্পিত বিডিআর বিদ্রোহ আরও পরিষ্কার জাকার্তা মেথড পরিকল্পনা ছিল। ২০০১ থেকে ভারতবিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়ে এবং তার সাথে আওয়ামী লীগকে যুক্ত করে পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে হত্যার খবরে ক্ষুব্ধ হবে সেনানিবাস, এবং তারা পাল্টা আক্রমণ করবে। পরিকল্পনা ছিল দুই পক্ষের এই গোলাগুলি শুরু হলে সারা দেশের সকল বিডিআর কার্যালয়ে এই হামলা শুরু হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষের সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হবে।
পরিকল্পনা ছিল এই লড়াইয়ের শুরুতেই হত্যা করা হবে শেখ হাসিনাকে এবং পাকিস্তানপন্থী মোল্লা মিলিটারিরা ক্ষমতা গ্রহণ করবে। ক্ষমতা গ্রহণ করেই এই পুরো হত্যা–যজ্ঞের দায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের উপর চাপিয়ে দেবে এই বলে যে তারা ভারতের স্বার্থের কারণে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সেনা কর্মকর্তাদের এই হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে।
পরিকল্পনা ছিল তখন গৃহযুদ্ধের কারণে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার অভিযোগে বিচারিক ও জেল হত্যা করে অন্তত ১০ লক্ষ আওয়ামী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের নেতা–কর্মী–সমর্থকদের হত্যা করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি চিরতরে নির্মূল করা।
২০০৯ সালে কিন্তু ভারত সজাগ ছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারা–কমান্ডোরা প্রস্তুত ছিল—বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথম গোলা ছোড়া হলেই তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। তারপর শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাসের কর্মীদের উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। এতে বাংলাদেশের কেউ বাধা দিলে তিন দিক থেকে ভারতীয় বাহিনী প্রবেশ করবে। এই খবর তখনকার সেনাপ্রধানের কাছে পৌছালে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন–নির্ভর ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনও একই পরিকল্পনায় করা হয়েছিল। গণভবনে শেখ হাসিনাকে হত্যা করে তার নগ্ন লাশ ট্রাকের পেছনে বেঁধে সারা শহরে ঘোরানো—এমন পরিকল্পনা ছিল। এতে তাঁর ভক্ত এবং সমর্থকদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হবে এবং তারা যার যা আছে তাই নিয়ে রাস্তায় নেমে আসবে। তখনই মাঠে নেমে যেত সশস্ত্র ছাত্র ও কিশোর গ্যাং মিলিশিয়ারা। শুরু হয়ে যেত গৃহযুদ্ধ। এই গৃহযুদ্ধে নিহতদের বিচার হত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। বিচারিক ও জেলখানায় হত্যা করা হত অন্তত ১০ লক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, সমর্থককে। ২০২৪ সালের এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায় যখন ভারতীয় সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান।
আমেরিকা আমাদের কাছে অনেক কিছু চায়। সেই চাওয়ার কারণে তাদের কিছু পরিকল্পনা আছে। অপরদিকে পাকিস্তান ১৯৭১ সালের পরাজয় মানে না। দেশে থাকা তাদের চাকর–নফর মোল্লা–মিলিটারি রাজাকার–আলবদর গোষ্ঠী বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। আর এক দল চায় ইরান স্টাইলে ইসলামী বিপ্লব করতে। উভয়েরই প্রধান বাধা বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
সেই কারণে সেই জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকে তারা সমূলে বিনাশ করতে চায়। এটা ১৯৭১–এর যুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা। এটা যেন আমরা দেখেও দেখছি না এবং আমেরিকা ও পাকিস্তানকে আলাদা করে দেখছি। আলাদা আমেরিকার লক্ষ্য জাকার্তা মেথডের মতো বিপজ্জনক নয়, আবার পাকিস্তানের ক্ষমতাও নেই জাকার্তা মেথডের মতো সুপরিকল্পিত কিছু করা। তাই আলাদাভাবে চিন্তা করলে তাদের কাউকেই দায়ী করা কেউ মেনে নেবে না। অথচ উভয় লক্ষ্যকে সন্নিবেশিত করে একটি দেশি–বিদেশি গোষ্ঠী এটিকে বাস্তবায়িত করতে চাইছে। এদের সামনে নিয়ে আসা এবং নিরস্ত করা ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্রসহ সকল বিষয়ে বিচার–বিবেচনা করা অথবা সুশাসন আশা করা বা বাংলাদেশের ভবিষ্যত চিন্তা অর্থহীন।
© সিরাজুল হোসেন
