দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও ভোগান্তি ইউরোপকে নিয়ে গিয়েছিল এক ভয়ংকর ভৌত ও মানসিক ট্রমার মধ্যে। সেই ট্রমাকে মোকাবেলা না করে, অনিষ্পন্ন অবস্থায় রেখেই তারা ক্রমাগত হিটলারকে খলনায়কীকরণ (ভিলিফাই) করেছে এবং মিডিয়া ও হলিউডের মাধ্যমে নানা কল্পকাহিনি ছড়িয়ে মিত্রপক্ষের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের নায়কীকরণ করেছে।
নিজেদের নিষ্পাপ, পবিত্র ও শুদ্ধ ভেবে লিবারেলিজম, শান্তিবাদ এবং বিশ্বায়নবাদে নিমজ্জিত হয়েছে; আর নিজেদের হয়ে সংঘটিত নানা অন্যায় যুদ্ধ, সরকার পরিবর্তন ও গণহত্যার মতো অপকর্মের ভার তারা আমেরিকার ঘাড়ে চাপিয়েছে।
ইউরোপের সবার একটি কমন বৈশিষ্ট্য হলো—তারা মানসিকভাবে ট্রমাগ্রস্ত। নির্যাতন থেকে উৎপন্ন অনিষ্পন্ন বা আনরিজলভড ট্রমা মানুষকে প্রতিক্রিয়াশীল এবং নির্যাতনকারীতে পরিণত করতে পারে; যারা অন্যের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশকে ঈর্ষা করে এবং চেতন–অবচেতনে সেটিকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। গত ৫০ বছরে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম সমাজের ওপর পশ্চিমাদের নাৎসীসুলভ আচরণে এর প্রকাশ লক্ষ্য করা গেছে। তবুও অনেকেই মৌলবাদী মুসলিমদের অশিক্ষা, বর্বরতা ও নৃশংসতাকেই এর জন্য দায়ী করেছে।
কিন্তু সম্প্রতি ইউক্রেন ও ফিলিস্তিনের ঘটনাবলি ইউরোপীয়দের নাৎসী চরিত্রের দিকটি প্রকটভাবে সামনে আনছে। এই নাৎসী চরিত্র অনিষ্পন্ন বা আনরিজলভড ট্রমা থেকেই উৎপন্ন। যার লক্ষণ এখন প্রকট ইসরায়েলিদের চরিত্রে। অন্যদের মধ্যেও সেটি দ্রুতই প্রকাশিত হবে। সম্প্রতি মিউনিখে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভাষণ যেন সেই শীতল স্রোতধারা বয়ে দিয়েছে উপস্থিত ইউরোপীয়দের শিরদাঁড়ায়।
মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জার্মানির মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন।
রুবিও তার ভাষণে মার্কিন–ইউরোপীয় সম্পর্ককে “ঐতিহাসিক জোট” হিসেবে বর্ণনা করেন, যা বিশ্বকে রক্ষা ও পরিবর্তন করেছে। তিনি বলেন, শীতল যুদ্ধের পর “ইতিহাসের সমাপ্তি”র মিথ্যা ধারণা থেকে ইউরোপ ও আমেরিকা ভুল পথে চলেছে—অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন, ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন, দুর্বল প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের অবক্ষয়ের মাধ্যমে। তিনি ইউরোপীয়দের খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পশ্চিমা সভ্যতার গর্ব ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান এবং “অপরাধবোধ ও লজ্জা” থেকে মুক্ত হয়ে নতুন “পশ্চিমা শতাব্দী” গড়ার কথা বলেন।
রুবিও জোর দিয়ে বলেন, “আমরা আলাদা হতে চাই না; বরং পুরোনো বন্ধুত্বকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাই এবং মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতাকে নতুন করে গড়তে চাই।” তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিকে ইউরোপের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন, তবে প্রয়োজনে একা এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির কথাও উল্লেখ করেন। ভাষণে ইউক্রেন যুদ্ধের ন্যায়সঙ্গত আলোচনামূলক সমাধান, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইন সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সামগ্রিকভাবে ভাষণটি ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ভাষণের মূল পয়েন্টসমূহ ছিল:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের “সন্তান”—ইতালীয়, ইংরেজ, জার্মান, ফরাসি ও স্প্যানিশ অভিবাসীদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। খ্রিস্টধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও মূল্যবোধ আমাদের এক করে। “আমেরিকা ও ইউরোপ—আমরা একসঙ্গে থাকব।”
অতীতের সাফল্য (রেনেসাঁ, বিজ্ঞান বিপ্লব, সঙ্গীত, শিল্প) নিয়ে গর্ব করুন, অপরাধবোধ ছুড়ে ফেলুন। “সেনাবাহিনী বিমূর্ত ধারণার জন্য লড়ে না—লড়ে জাতি, মানুষ ও জীবনধারার জন্য।”
সবচেয়ে বড় সমস্যা অনিয়ন্ত্রিত গণ–অভিবাসন, যা সমাজের সংহতি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জাতীয় কর্তব্য, কোনো বর্ণবাদ নয়।
অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা: মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা থেকে ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন ঘটেছে। ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে হবে, সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত করতে হবে এবং পুনরায় শিল্পায়ন করতে হবে। জলবায়ু নীতি যেন প্রতিযোগীদের সুবিধা না দেয়।
“আমরা একসঙ্গে নতুন পশ্চিমা শতাব্দী গড়ব—এআই, স্পেস ও উন্নত উৎপাদনের মাধ্যমে।” জাতীয় সার্বভৌমত্ব, শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা ও যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে জোট পুনর্গঠন এবং জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের সংস্কার প্রয়োজন।
ইউক্রেন যুদ্ধের আলোচনামূলক সমাধান প্রক্রিয়া চলছে। চীনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হবে, তবে পশ্চিমা ঐক্য বজায় রাখতে হবে।
ভাষণটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক নীতির একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছে—“আমেরিকা ফার্স্ট মানে আমেরিকা একা নয়, বরং শক্তিশালী ও সমান অংশীদারিত্ব।”
ইউরোপিয়নরা অনেকেই ভাষণটিকে ইউরোপের প্রতি আমেরিকার বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমেরিকা ইউরোপকে যে লিবারেলিজম, শান্তিবাদ ও বিশ্বায়নবাদের পথে নিয়ে গিয়েছিল—হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো আহ্বান জানিয়ে—এখন তারা সামনে অনিশ্চয়তা ও হতাশার সাগর দেখতে পাচ্ছে। এখন তারা পাবে ভয়। সেই ভয় থেকেই সকল ফ্যাসিজমের উৎপত্তি।
