কালো আলোর বিতরণকারীরা

ইলুমিনাতি মানে আলোকিত, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র মানে আলোকিত মানুষ, কিন্তু কোন আলো?

বিখ্যাত মার্কিন তেল শিল্পস্থপতি ও উদ্যোক্তা জন ডেভিসন রকফেলার তখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনবান ব্যক্তি। কৈশোর পেরোলেই তিনি তাঁর ছেলে ডেভিড রকফেলারকে বলেছিলেন "তোমাকে আমি একটি পয়সাও দেব না। তোমাকে নিজে উপার্জন করে খেতে হবে"। তিনি ছেলেকে কোন হাতখরচও দিতেন না। ডেভিডের এটা নিয়ে খুব সমস্যা হত। কারণ বন্ধুরা জানতে সে বিশাল বড়লোকের ছেলে তাই খাবার খেয়ে বিলটা তার দিকেই বাড়িয়ে দেয়া হত। 

সেই ডেভিড রকফেলার দেখেন রাজনীতিবীদেরা দেশ চালান চার বা পাঁচ বছরের জন্য। তার পর প্রতিস্তাপিত হয়ে যান। ব্যবস্থাটি ব্যাংকিং, ব্যবসা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির দীর্ঘ পরিকল্পনা ও প্রয়োগের জন্য সহায়ক নয়। তখন তিনি প্রস্তাব করেন একটি ত্রিধা-বিস্তৃত বা ট্রাইল্যাটারাল কমিশনের। যেখানে ব্যাংকিং, ইনভেস্টমেন্ট, ব্যবসা এবং নীতনির্ধারক - এমন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা একটি জোট গঠন করবে যেটা হবে আন্তর্জাতিক। তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী নীতিমালা প্রনয়ণ করবে। রাজনৈতিক সরকাররা হবে সেই ত্রিধা-বিস্তৃত শক্তির হাতের পুতুল। 

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রভাব কমতে থাকে, জাপান এবং পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতি দ্রুত বাড়ছে, এবং শক্তি (ওপেক) সংকট বিশ্বব্যাপী সমস্যা তৈরি করে। এই সময়ে ডেভিড রকফেলার, চেজ ম্যানহ্যাটন ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান এবং একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় একটি নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন অনুভব করেন। তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিগনিউ ব্রজেজিনস্কি (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা) এর সাথে মিলে উক্ত ট্রাইল্যাটারাল কমিশনটি গঠন করেন।   

এর পর মুক্ত অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গ্লোবালিজম এবং মিলিটারিজম প্রসারিত হলে এই একই ক্যাবাল একটি মহাশক্তিতে পরিণত হয়। এর সাথে যুক্ত হয় মোসাদ ও সিআইএর এর মত গোয়েন্দা চক্র। ডেভিড রকফেলার সেই ট্রাইল্যাটারাল কমিশনে যুক্ত হবার জন্য জেফরি এপস্টিনকে আমন্ত্রণ জানালে ফর্ম পুরণ করতে গিয়ে তিনি দেখেন সবার আগে বিল ক্লিনটেনর নাম।       

যখন থেকেই পশ্চিমা বিশ্বের ব্যবসায়ী ও গোয়েন্দা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকেরা খেয়াল করেছে যে অন্য একটি দেশের সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনীতি বা নিরাপত্তা বলয়ের উপর নির্ভরশীল, তখন থেকেই তারা মনে করতে থাকে উক্ত নির্ভরশীল দেশের কোন নিজস্ব রাজনীতি থাকার প্রয়োজন নেই। বাইরে ট্রাইল্যাটারাল কমিশনের মত একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আবরণ কিন্তু ভেতরে একটি নগ্ন নোংরা সামরিক বা গোয়েন্দা ক্ষমতার ক্যাবাল বা অপগোষ্ঠি সেই দেশটির রাজনীতির কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে পশ্চিমা দেশের লোভ ও ক্ষুধা মেটানোর জন্য। 

নির্ভরশীল দেশের ভেতরের জাতীয়তাবাদ এবং মাটির রাজনীতিকে ধ্বংস না করলে এই বিশ্বায়নের রাষ্ট্রদখল প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন প্রচুর 'আলোকিত' তরুণ যারা হবে সাদা মনের মানুষ -ইলুমিনাতির ঝান্ডাবাহী বিরাজনৈতিক শক্তি। জাতীয়তাবাদ, নিজস্ব রাজনৈতিক মতবাদ, প্রকৃত স্বাধীনতা জন্য জীবন দেবার মত নেয়ার   

১৭৭৬ সালের ১ মে জার্মানির বাভারিয়ায় ইঙ্গোলস্ট্যাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাডাম ওয়েইশাউপ্ট “বাভারিয়ান ইলুমিনাতি” নামে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এবং তার অনুসারীরা নিজেদের “পারফেক্টিবিলিস্ট” (Perfectibilists) বলে ডাকতেন। এটি আলোকিত যুগের (Enlightenment) আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিল—যুক্তি, বিজ্ঞান এবং মানুষের নৈতিক উন্নয়নের উপর জোর দিয়ে ধর্মীয় কুসংস্কার ও রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করা।

সংগঠনটি দ্রুত প্রসার লাভ করে। ১৭৮০-এর দশকে এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ২,০০০-এ পৌঁছে যায়, যারা বাভারিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ১৭৮৪-৮৫ সালে বাভারিয়ার সরকার তাদের নথিপত্র আটক করে এবং সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ওয়েইশাউপ্টকে নির্বাসিত করা হয় এবং সংগঠনটি ইতিহাস থেকে মুছে যায়।

তাদের ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য ছিল মোটামুটি সরল এবং আলোকিত যুগসম্মত রাষ্ট্র ও ধর্মের অত্যধিক প্রভাব কমিয়ে যুক্তিবাদী সমাজ গড়ে তোলা, মানুষের নৈতিক উন্নতি এবং রাজতন্ত্রের অবসান। কোনো বিশ্ব-আধিপত্যের পরিকল্পনা ছিল না।

কিন্তু আধুনিক ডিপস্টেট যদিও সেই ইলুমিনাতি নয়, যদিও দর্শনটা একই। যারা একটি অদৃশ্য গোষ্ঠি বা ক্যাবাল যারা ধর্ম, জাতীয়তাবাদ ধ্বংস করে একটু অদৃশ্য একক বিশ্ব-সরকার গড়বে এবং মানুষকে দাসত্বে পরিণত করবে। 

আধুনিক ইলুমিনাতি হল একটি জায়নবাদী সুপ্রিমিজম ও দাভোস গ্লোবালিস্ট এলিটিস্টদের একই ছাঁচে গঠিত একটি সামরিক অর্থনৈতিক গোয়েন্দা চক্র যারা নরম শক্তি প্রয়োগ করে কোন দুর্বল ও নির্ভরশীল অর্থনীিতি ও সামরিক ক্ষমতাবিহীন রাষ্ট্রের দখল নিয়ে নেয়।

ট্রাইল্যাটারাল কমিশনের মত ইহুদি ও পশ্চিমা বিশ্বের “অল্প কিছু 'আলোকিত' মানুষই সুপিরিয়র, তারাই ঠিক করবে সারা দুনিয়া কীভাবে চলবে” - এটাই আধুনিক ইলুমিনাতির দর্শন। যেখানে স্থানীয় রাজনীতি এবং তাদের স্বাধীনতা মূখ্য নয়।  

এই এলিট-সেন্ট্রিক হায়ারার্কি এক ধরনের পিরামিডাল কাঠামো যেখানে শীর্ষে একটি ছোট ‘সুপিরিয়র’ গ্রুপ (এলিট) যারা নিজেদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক, আধ্যাত্মিক, বৈজ্ঞানিক, নৈতিকভাবে উচ্চতর মনে করে, তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে।

তাদের লক্ষ্য সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যৎ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা নির্ধারণ করা — সাধারণ মানুষের মতামত বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়াই।গোপনীয়তা, অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ও গোয়েন্দাচক্রের মাধ্যমে এই নিয়ন্ত্রণ চালানো হয়, যাতে বাইরের লোকেরা না বুঝতে পারে।

এই কাঠামোটি হল “এলিট প্যাটার্নালিজম” — কয়েকজন ‘জ্ঞানী পিতা’ যারা সবাইকে ‘শিশু’ ভেবে বিশ্ব চালাবে।

দাভোস গ্লোবালিস্টদের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফ্রেমওয়ার্ক কয়েকশো সিইও, রাষ্ট্রনেতা ও ‘থট লিডার’ যারা নিজেদেরকে ‘স্টেকহোল্ডার ক্যাপিটালিজম’-এর মাধ্যমে বিশ্বের সমস্যা সমাধানের একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি মনে করে। “গ্রেট রিসেট” বা অনুরূপ এজেন্ডায় তারাই ঠিক করে কীভাবে অর্থনীতি, জলবায়ু, প্রযুক্তি ও সমাজ চলবে — সাধারণ নাগরিকের ভোট বা স্থানীয় সংসদ ছাড়াই।

স্থানীয় রাজনীতির বিলুপ্তির এই গ্লোবাল মহাপরিকল্পনায় এদেরই স্থানীয় এজেন্ট হল সকল 'আলো' গোষ্ঠী। উচ্চতর পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্ররা ছাড়া অন্ররা জানে না যে আলোও কালো হয় যাকে বলা হয় ব্ল্যাক লাইট বা কালো রশ্মি যেটা ক্যান্সার তৈরি করে।

© সিরাজুল হোসেন