হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান মূলত মিশরের রাষ্ট্রপিত গামাল আবদেল নাসের হুসেনের ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের অনুরূপ একটি পদক্ষেপ নিয়েছে।
১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করেন। এরপর মিশর খালের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং টোল আদায়ের ব্যবস্থা চালু রাখে। জাতীয়করণের আগে সুয়েজ খাল কোম্পানি ছিল একটি বেসরকারি কোম্পানি, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত ব্রিটিশ ও ফরাসি শেয়ারহোল্ডারদের হাতে। যার মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ছিল সবচেয়ে বড় শেয়ার। টোল বা মাশুল জাহাজ কোম্পানিগুলো সরাসরি সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানিকে পরিশোধ করত যা সাধারণত ব্রিটিশ স্টার্লিং পাউন্ড, ফরাসি ফ্রাঁ বা অন্যান্য হার্ড কারেন্সিতে - প্রধানত ইউরোপীয় মুদ্রায় ছিল।
মিশর সরকারকে কোম্পানির নেট প্রফিটের মাত্র ১৫% দেওয়া হতো (১৮৫৪-১৮৬৬ এর কনসেশন অনুসারে)। বাকি লাভ চলে যেত বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের কাছে (প্রধানত লন্ডন ও প্যারিসে)। খালের অপারেশন, পাইলট, রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত এই কোম্পানি। মিশরের সার্বভৌমত্ব খুব সীমিত ছিল।
জাতীয়করণের প্রথম দিকে ব্রিটিশ স্টার্লিং বা ফরাসি ফ্রাঁ-এর পরিবর্তে মিশরীয় পাউন্ডে টোল পরিশোধের দিকে জোর দেওয়া হয় এবং বৈরী দেশগুলোর সাথে আর্থিক লেনদেনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সাথে আর্থিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে উভয় পক্ষ তাদের সম্পদ জব্দ কে এবং পরবর্তীতে টোল ব্যবস্থায় কিছু বৈষম্যমূলক (ভিন্ন দেশের জন্য ভিন্ন) পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মিশর জাতীয়করণের সাথে সাথে সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানির যে সম্পদ মিশরে অবস্থিত ছিল (অফিস, যন্ত্রপাতি, স্থাবর সম্পত্তি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি), তা ফ্রিজ (জব্দ/স্থগিত) করে। কোম্পানির কর্মীরা দেশ ছাড়তে নিষেধ করা হয় (যাতে অপারেশন বন্ধ না হয়)। তবে শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় (প্যারিস স্টক এক্সচেঞ্জের দাম অনুসারে)।
ব্রিটেন ও ফ্রান্স পাল্টা আর্থিক যুদ্ধ ঘোষনা করে। তারা গামাল নাসেরের জাতীয়করণের অব্যবহিত পরেই ব্রিটেন মিশরের সম্পদ বা স্টার্লিং অ্যাসেটস ফ্রিজ বা স্থগিত করে দেয়। এতে প্রায় ১১০ মিলিয়ন পাউন্ড যা তৎকালীন মূল্যে বিশাল অঙ্কের মিশরের সম্পদ, সেটা ব্রিটেনে আটকে যায়। ফ্রান্সও অনুরূপ পদক্ষেপ নেয়। এই "স্টার্লিং ব্যালেন্স" ছিল মিশর সরকার ও মিশরীয়দের ব্রিটিশ ব্যাংকে রাখা অর্থ, যা যুদ্ধকালীন ও পরবর্তী সময়ে জমা হয়েছিল।
ব্রিটেনের লক্ষ্য ছিল মিশরকে আর্থিকভাবে চাপে ফেলা, যাতে নাসের টোলের অর্থ কোম্পানিকে না দিয়ে নিজের কাছে রাখতে না পারেন।
১৯৫৭ সালের এপ্রিলে খাল পুনরায় খোলার পর টোল আদায় অব্যাহত থাকে। তবে এসডিআর (SDR) ব্যবস্থা ১৯৫৭ সালে চালু হয়নি। এসডিআর বা স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (বিশেষ উত্তোলন অধিকার) হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) কর্তৃক ১৯৬৯ সালে প্রবর্তিত একটি সম্পূরক আন্তর্জাতিক রিজার্ভ সম্পদ। এটি কোনো সাধারণ মুদ্রা নয়, বরং পাঁচটি প্রধান মুদ্রার (মার্কিন ডলার, ইউরো, চীনা ইউয়ান, জাপানি ইয়েন ও ব্রিটিশ পাউন্ড) ভিত্তিতে তার মূল্য নির্ধারিত হয়। আইএমএফের সদস্য দেশগুলোর অফিসিয়াল রিজার্ভ বাড়াতে এবং আর্থিক সহায়তায় এটি ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে সুয়েজ খালের টোল প্রায়ই SDR ইউনিটের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং হার্ড কারেন্সিতে পরিশোধ করতে হয়।
ইরান এখন হরমুজ প্রণালীতে অনুরূপ কিন্তু আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে (বিশেষ করে ৩০-৩১ মার্চ) ইরানের সংসদ “হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা” অনুমোদন করে। এতে ইরানীয় বিপ্লবী গার্ড আইআরজিসি (IRGC)-এর তত্ত্বাবধানে টোল ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলো (যেমন চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরাক ইত্যাদি) কম হারে বা বিশেষ সুবিধায় ট্রানজিট পাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বা উচ্চ হারে চার্জ করার নিয়ম চালু করা হয়েছে। এটি শুধু ফি আদায় নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরির প্রয়াস, যেখানে দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান অনুসারে অর্থপ্রদানের মান ও পদ্ধতি নির্ধারিত হবে।
ইরান মার্কিন ডলার ও সুইফট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বর্জন করে কুনলুন ব্যাংকের মাধ্যমে সিআইপিএস (CIPS), চীনা ইউয়ান, বিটকয়েন, ইউএসডিটি (USDT) এবং ইরানি রিয়ালের মাধ্যমে ফি পরিশোধের অনুমোদন দিয়েছে। সিআইপিএস (CIPS) বা ক্রস বর্যার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম হলো চীনের নিজস্ব আন্তঃসীমান্ত ব্যাংকিং পেমেন্ট সিস্টেম। ২০১৫ সালে চালু হওয়া এই ব্যবস্থা চীনা ইউয়ান (RMB)-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট করে। এটি পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত SWIFT-এর একটি বিকল্প হিসেবে পরিচিত এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক।
ইউএসডিটি (USDT) বা টিথার হলো স্টেবলকয়েন ক্রিপ্টোকারেন্সির একটি ধরন। এর মূল্য মার্কিন ডলারের সাথে ১:১ অনুপাতে স্থিতিশীল রাখার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি ক্রিপ্টো লেনদেনে ডলারের মতো স্থিতিশীল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং নিষেধাজ্ঞা-প্রভাবিত এলাকায় জনপ্রিয়।
এই সমান্তরাল ব্যবস্থা ব্লকচেইন প্রযুক্তিসহ এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে রিয়েল টাইমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কঠিন হয়। নাসের স্টার্লিং ও ফ্রাঙ্ককে চাপে ফেলেছিলেন; ইরান ডলারকে আরও খোলামেলাভাবে বাদ দিয়ে বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করেছে।
এই পদ্ধতিতে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি মাসে কয়েকশ মিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় সম্ভব (প্রতি ভিএলসিসি জাহাজ থেকে ২০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত চার্জের হিসাবে)। এলএনজি জাহাজসহ অন্তর্ভুক্ত করলে মাসিক ৬০০-৮০০ মিলিয়ন ডলারের আশা করা হয়েছে। তবে বর্তমানে যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে ট্রাফিক কম থাকায় প্রকৃত আয় এখনও সীমিত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ধারণাটিকে “এ বিএউটিফুল থিং” বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রেরই বরং এভাবে টোল আদায় করা উচিত - "আমরা কেন করব না? আমরাই তো বিজয়ী। আমরা জিতেছি"। তিনি ইরানের একতরফা টোলকে সমালোচনা করলেও, চার্জ আদায়ের ধারণাটিকে স্বীকার করেছেন এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন।
পুরো বিষয়টি এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে যে এটি নৌচলাচল আইনের সাধারণ বিষয় নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের খাজনা কে নিয়ন্ত্রণ করবে তা নিয়ে লড়াই। UNCLOS বা জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সংক্রান্ত কনভেনশন, ১৯৮২ হলো সমুদ্রের আইনি কাঠামো নির্ধারণকারী আন্তর্জাতিক চুক্তি। এর ৩৮ অনুচ্ছেদ আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক প্রণালীতে টোল ছাড়াই ট্রানজিট প্যাসেজ (অবাধ যাতায়াত)-এর অধিকার দেয়। যেখানে সুয়েজ খাল মানবসৃষ্ট অবকাঠামো হওয়ায় টোল গ্রহণযোগ্য, কিন্তু হরমুজ একটি প্রাকৃতিক প্রণালী।
কিন্তু ইরান আগে থেকেই UNCLOS অনুমোদন করেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রও করেনি সুতরাং তারা কেউই এই চুক্তির আওতায় পড়ে না। ইরান যুক্তি দিচ্ছে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা অনেকটা গামেল নাসেরের “ঔপনিবেশিক ছাড়পত্র” যুক্তির অনুরূপ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদ স্পিকার প্রকাশ্যে বলেছেন যে হরমুজ “কখনোই তার পূর্বের অবস্থায় ফিরবে না”। ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি সফল হলেও সেটা এই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করবে না। ইসলামাবাদে চলমান আলোচনায় নির্ধারিত হবে যে এই টোল স্থায়ী চুক্তিগত অধিকারে পরিণত হবে, নাকি অস্থায়ী যুদ্ধকালীন ব্যবস্থা হিসেবে থাকবে যা এর মধ্যেই বিফল হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি করে পশ্চিমারা যা মেনে নিতে পারছে না সেটা হল, শুধু ২০ লক্ষ ডলারের ফি নয় — বরং এর পেছনের নজির। হরমুজে ইরানি টোলবুথ প্রতিষ্ঠা করলে অন্যান্য উপকূলীয় প্রণালী যেমন মালাক্কা, বাব এল-মান্দেব ইত্যাদিতে একই ধরনের দাবি তুলতে উৎসাহিত হতে পারে, উপকুলীয় দেশগুলো যদি যথেষ্ট সামরিক চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
শয়তানবাদী ইসরাইল সহ আমেরিকার আগের সরকারগুলো গোপনে কিন্তু আমেরিকার বর্তমান সরকার খোলামেলাভাবে ঘোষণা দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, প্রথা এবং জাতিসংঘের চুক্তি বা সম্মতিগুলো অবজ্ঞা করার মরণ খেলায় নেমেছে। তারা বুঝতে পারছে না শয়তানের শক্তিই হল অপরের অধিকার হরণ। আর সেটা প্রকাশ্যে করা শুরু করলেই সকল সামাজিক রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে। তখন সারা সর্বত্র দুর্দশা ও ভোগান্তি নেমে আসে। তখন শয়তানবাদীদের বিপক্ষে জড় হতে থাকে মানুষ।
