EN
আরও পড়ুন
রাজনীতি
মনিব আমেরিকা ত্যাজ্য করেছে
মানসিক সমৃদ্ধি ও সম্পর্ক
মুখে জয় বাংলা হাতে ছুরি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
অপারেটর, অগ্নিনির্বাপক কর্মী, স্থানান্তরিত এবং বেঁচে যাওয়া মানুষদের গল্প — বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনায় আটকে পড়া মানুষদের কাহিনি
রাজনীতি
শয়তানবাদীদের খোলামেলাভাবে আন্তর্জাতিক আইন, প্রথা এবং জাতিসংঘের চুক্তি অবজ্ঞা
JadeWits Technologies Limited
রাজনীতি

‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্টের বিশ্লেষণ:

কী হচ্ছে মধ্যপ্র্যাচ্যে, কী হয়েছে ইরান যুদ্ধে, কেন আরব বিশ্ব বিভক্ত, কী করতে চাইছে ইসরায়েল, আমেরিকা কোন ফাঁদে আটকা পড়েছে?

কী হচ্ছে মধ্যপ্র্যাচ্যে, কী হয়েছে ইরান যুদ্ধে, কেন আরব বিশ্ব বিভক্ত, কী করতে চাইছে ইসরায়েল, আমেরিকা কোন ফাঁদে আটকা পড়েছে? - এমন হাজারো প্রশ্ন এখন মধ্যপ্র্যাচ্য নিয়ে যেখানে গণহত্যাকারীরা একটি জাতিকে দেশছাড়া করছে, এর সাথে জ্বালানী, ভূরাজনীতি ও বিকারগ্রস্থ রাষ্ট্রপ্রধানদের হতভম্ভকারী সিদ্ধান্ত এবং তাদের গোপন ও খোলামেলা শয়তানী পরিস্থিতিকে করে তুলেছে এমনই জটিল যে কী হচ্ছে সেটা বোঝাই হয়ে উঠেছে দুরূহ।

এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট। যথেষ্ট পরিষ্কার এবং নিরপেক্ষতার সাথে তাঁর বলা কথাগুলো থেকে অনেকটাই পরিষ্কার হবে কী হচ্ছে মধ্যপ্র্যাচ্যে যার বাংলা অনুবাদ দেয়া গেল।  

ডেভিড হার্স্ট ‘মিডল ইস্ট আই’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক।
তিনি এই অঞ্চল বিষয়ে একজন ভাষ্যকার ও বক্তা এবং সৌদি আরবের সম্পর্কীত একজন বিশ্লেষক। পূর্বে তিনি ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর বৈদেশিক সম্পাদকীয় লেখক ছিলেন এবং রাশিয়া, ইউরোপ ও বেলফাস্টে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ‘দ্য স্কটসম্যান’ থেকে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ যোগ দেন, যেখানে তিনি শিক্ষা বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন।

----

এটি প্রথমবার নয়—যখনই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদিন যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থান নিচ্ছেন, তখনই আমাদের বলা হচ্ছে যে ইরান-এর সঙ্গে একটি চুক্তি খুব কাছাকাছি। বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয়েরই হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া প্রয়োজন। ট্রাম্পের প্রয়োজন, কারণ তেলের দাম বেড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে।

আর ইরানের প্রয়োজন, কারণ তাদের তেল সংরক্ষণাগার প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে, এবং শিগগিরই হয়তো তাদের তেল উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে। এই বৃহৎ সমঝোতা যেভাবেই হোক না কেন, এবং যদি আদৌ কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—ট্রাম্প এক অচলাবস্থায় গিয়ে ঠেকেছেন।

তিনি যদি আবার যুদ্ধে ফিরে যান, তাহলে তার অর্থ হবে ইরানের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা। জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামো ধ্বংস করবে। যদি মার্কিন মেরিন বাহিনী প্রণালীর ভেতরের ইরানি দ্বীপগুলো দখল করে, তাহলে তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে—এমন ভূখণ্ডে, যেখানে আত্মরক্ষার মতো কোনো প্রাকৃতিক আড়াল নেই।

এ ধরনের অভিযান ট্রাম্পের জন্য “গ্যালিপলি” হয়ে উঠতে পারে। যদি তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে বলা যায়—এটি ছিল উইনস্টন চার্চিলের এক ভয়াবহ সামরিক বিপর্যয়, যা ট্রাম্প নিশ্চয়ই পুনরাবৃত্তি করতে চাইবেন না। যুদ্ধ আবার শুরু হলে এর ভৌগোলিক বিস্তৃতিও বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আবার বোমাবর্ষণ শুরু করে, তাহলে ইরান যে লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খাল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে—তা কোনো ব্লাফ নয়। ট্রাম্প যদি শান্তির পথ বেছে নেন, তাহলে তা হবে তার ঘোষিত যুদ্ধলক্ষ্যের তুলনায় অনেক কম অর্জনের শর্তে। একটি চুক্তি হলে সেখানে হরমুজ ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ—এই দুই বিষয়কে আলাদা করা হবে।

কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া উচিত—ইরান যদি সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র চাইত, তাহলে বহু আগেই তা তৈরি করে ফেলতে পারত। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি কমিশনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে কোনো সংগঠিত ও সক্রিয় পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ তৈরি হয় কেবল তখনই, যখন ট্রাম্প বারাক ওবামার সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন। এই উচ্চ পরিশোধীত ইউরেনিয়াম মূলত একটি দরকষাকষির হাতিয়ার, যা সঠিক মূল্যের বিনিময়ে তেহরান সহজেই সরিয়ে ফেলতে পারে—হয় পাতলা করে, যেমন তারা ইতিমধ্যেই প্রস্তাব দিয়েছে, অথবা পাকিস্তানে পাঠিয়ে।

আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় ট্রাম্পের তিনটি বড় ক্ষতি হবে।

প্রথমত, কোনো শাসন পরিবর্তন হবে না—বরং উল্টোটা ঘটবে। ট্রাম্প কার্যত বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছেন। দ্বিতীয়ত, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচির আত্মসমর্পণ হবে না।

তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালী কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। ট্যাংকারগুলো যত স্বাধীনভাবেই চলাচল করুক না কেন, ইরান কোনো না কোনোভাবে এর বিনিময়ে মূল্য আদায় করবে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো কোনো চুক্তিকে ট্রাম্পের পক্ষেও “বিজয়” হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন হবে—বিশেষ করে যখন এর পেছনে ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৩৬০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।

ট্রাম্পের ইরান আক্রমণ সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থবহ হতে পারত, যদি মেসাদ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও সামরিক নেতৃত্বকে হত্যার কয়েক দিনের মধ্যেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে সফল হতো। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা সূত্র থেকেই স্পষ্ট—শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে শাসন পরিবর্তন ঘটানোই ছিল প্রকৃত পরিকল্পনা। যখন তা ব্যর্থ হলো, তখন ট্রাম্প বা বেনইয়ামিন নেতানিয়ায়ু - কারোরই কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ছিল না।

নেতানিয়াহু ও তার মোসাদ পরিচালক ডেভিয় বার্নিয়ার সম্ভবত তাদের “পেজার হামলা”-র সাফল্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন। লেবাননে সেই হামলায় ৪২ জন নিহত এবং হাজারো মানুষ পঙ্গু হয়েছিল।

বাস্তবে, পেজার হামলা এবং পরবর্তী সময়ে হেজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার পরও সংগঠনটি নতুনভাবে শক্তি সঞ্চয় করে। আজ তারা সীমান্তের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ওপর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দিচ্ছে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীইকে হত্যার পর শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনা তিন ধাপে বাস্তবায়নের কথা ছিল। প্রথম ধাপ ছিল কুর্দি মিলিশিয়াদের মাধ্যমে স্থল আক্রমণ। কিন্তু এটি থেমে যায় শুধু ইরানি কুর্দিদের বিরোধিতার কারণে নয়—যাদের চারটি গোষ্ঠী এই আত্মঘাতী উদ্যোগ থেকে নিজেদের আলাদা করে নেয়—বরং বাগদাদ ও আঙ্কারার চাপেও।

রেসেপ তায়িপ এরদোয়ান ট্রাম্পকে ফোন করে এটি থামানোর আহ্বান জানান, এবং ট্রাম্প তা মেনে নেন। দ্বিতীয় ধাপ ছিল গণবিক্ষোভ সৃষ্টি করা—যখন ইসরায়েলি বিমানবাহিনী আকাশ থেকে বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর উপর বোমাবর্ষণ করছিল।
তৃতীয় ধাপ ছিল বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ট্রাম্প দ্রুতই পিছিয়ে যান। নিজের প্রশাসনের ভেতর থেকেও তিনি তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জন র্যাক্লিফ—সবাই শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন। রুবিও একে “বুলশিট” বলেন, র‍্যাটক্লিফ একে “প্রহসন” বলে আখ্যা দেন—এবং শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্য প্রমাণিত হয়।

কুর্দি সামরিক নেতারা এই আক্রমণ পরিকল্পনা যত দ্রুত উত্থাপন করেছিলেন, প্রায় তত দ্রুতই তা বাদ দেন। রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছিল ঠিকই, তবে তা ছিল সরকারপন্থী। বিশেষ করে মিনাবের একটি স্কুলে বোমা হামলায় ১৫৬ জন নিহত হওয়ার পর—যাদের মধ্যে ১২০ জনই শিশু—ইরানে জনমত স্পষ্টভাবে ইসরায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে চলে যায়। যুদ্ধের আগে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থনের প্রশ্নে ইরানিরা অন্তত বিভক্ত ছিল।

তাদের পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ছিল না; তারা শুধু একটি স্বাভাবিক জীবন চাইত। ইরানিরা যেন দুই চরম অবস্থানের মধ্যে আটকে ছিল—একদিকে মোল্লাতন্ত্র, অন্যদিকে আমেরিকা—এমন ধারণা Tehran-এর কেন্দ্রীয় বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায়ই শোনা যেত। এখন সেই সবকিছু বদলে গেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনইয়ামিন নেতানিয়ায়ু ইরানিদের তাদের শাসনের হাত থেকে “উদ্ধার” করতে আসছেন—এই ধারণা এখন এক অসুস্থ রসিকতায় পরিণত হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিকল্প কোনো শক্তির প্রতি সমর্থনও তলানিতে নেমে গেছে।

যুক্তিতে জিততে না পেরে শেষ শাহের পুত্র রেজা পাহলভী-এর সমর্থকেরা এখন যুক্তরাজ্যে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস হামলার পথ বেছে নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী ইরানি পরিবারগুলোর মধ্যেও প্রজন্মভিত্তিক বিভাজন তৈরি হচ্ছে। শাসন পরিবর্তনের তিনটি স্তম্ভের প্রত্যেকটিই ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখন আক্রমণের আগের তুলনায় ইরানের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে এবং ড্রোন হামলার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছে যে পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে কোন ব্যবসা চলবে আর কোনটি চলবে না—সে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা এখনও তাদের হাতেই রয়েছে। উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের বিস্মিত করে দিয়ে এই জলপথ ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন আরও বেশি “পারস্যীয়” হয়ে উঠেছে।

ইরান সেই ঝকঝকে কিন্তু ভঙ্গুর সম্পদ ও বিশেষাধিকার-নির্ভর বুদবুদ ফাটিয়ে দিয়েছে, যার মধ্যে কুয়েত, ইউনাইটেড আরব আমিরাত, বাহরায়েন, সৌদি আরব এবং কাতারের শাসক এলিটরা বহু দশক ধরে তাদের চারপাশের অস্থিরতা ও দারিদ্র্য থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করছিল।

ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শুধু তেল টার্মিনাল, এআই সেন্টার ও হোটেলের ভৌত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করেনি—এসব হয়তো মেরামতযোগ্য। কিন্তু এটি সম্ভবত অপূরণীয়ভাবে ধ্বংস করেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের সেই “ব্র্যান্ড ইমেজ”, যেখানে ধনীরা এক ধরনের বিলাসী খেলার মাঠ পেয়েছিল, যা আশপাশের বাস্তবতা থেকে নিজেকে আলাদা ভাবত এবং কেবল নিজের কাছেই দায়বদ্ধ মনে করত।

দুবাই এবং আবুধাবীতেই ইরানের চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে।

ইরান কার্যত ইউনাইটেড আরব আমিরাতকে বিধ্বস্ত করেছে। ২৮ মার্চের মধ্যে তারা আমিরাতের দিকে ৩৯৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ১,৮৭২টি ড্রোন এবং ১৫টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, ফলে ইসরায়েলের পর সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া দেশ ছিল আমিরাত। এর প্রভাব ছিল নাটকীয়।

দুবাই ও আবুধাবীর শেয়ারবাজার থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজারমূল্য মুছে গেছে। ১৮,৪০০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকস অনুমান করেছে যে রিয়েল এস্টেট লেনদেন বছরওয়ারি হিসেবে ৩৭% কমে গেছে।

দুবাইয়ের বিখ্যাত সাতটি হোটেল—যার মধ্যে আরমানি হোটেল দুবাই, বুর্জ আল আরাব, পার্ক হায়াত দুবাই এবং দ্যা সেন্ট রেজিস ডাউনটাউন দুবাই রয়েছে—তাদের দরজা বন্ধ করছে, কারণ প্রায় ২,০০০ কক্ষ সংস্কারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

অবশ্য এখন “ব্র্যান্ড দুবাই” টিকিয়ে রাখতে এবং ঘটনাগুলোকে ইতিবাচক খবর হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চলছে। বলা হচ্ছে, এখন অফ-সিজন চলছে, তাই সংস্কারের ভালো সুযোগ। কোভিডের সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। আর পশ্চিমা উদারনীতির আবরণে মোড়া এই স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিদেশি বাসিন্দাদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে, যাতে তারা ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিও ধারণ করতে না পারে—কারণ তা দুবাইয়ের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্তত ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভিডিও বা ফুটেজ শেয়ার করলে ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারেরও বেশি জরিমানা এবং সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। হামলাগুলো শুধু দুবাইয়ের পর্যটন শিল্প বা আবুধাবির তেল উৎপাদন বন্ধ করেনি।

এমিরেটস গ্লবাল অ্যালুমিনিয়ামের আল তাওয়িলাহ অ্যালুমিনিয়াম স্মেল্টার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে।

এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়ামের উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং কাতারের স্মেল্টারগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে বছরে ৩০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা অফলাইনে চলে গেছে—যা মধ্যপ্রাচ্যের মোট অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক।

দুবাইয়ের স্বর্ণবাজারও তার জৌলুস হারিয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সিঙ্গাপুর দুবাই থেকে ১,৪৪৬ কেজি স্বর্ণের বার ফেরত পাঠিয়েছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা বীমা সুবিধা ও জরুরি সময়ে স্বর্ণ হাতে পাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

দুবাই থেকে গহনা রপ্তানি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই অবস্থা ডেটা সেন্টারগুলোর ক্ষেত্রেও ঘটছে। পিওর ডেটা সেন্টারস গ্রুপ এই অঞ্চলে তাদের বিনিয়োগ স্থগিত করেছে, কারণ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে তাদের দুটি ডেটা সেন্টার ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকিং ও পেমেন্ট ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।

আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, কিংবা এটি পূর্বঘোষণা ছাড়াও হয়নি। ইরান আগেই সতর্ক করেছিল যে তারা এমনটি করবে। ইরানি সূত্রগুলো মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছে যে ইরানি গোয়েন্দারা আমিরাতের ভূমিকা সম্পর্কে এমন তথ্য পেয়েছে, যা শুধু মার্কিন ঘাঁটি আতিথ্য দেওয়ার চেয়েও অনেক বেশি গভীর।

ইরানি গোয়েন্দাদের দাবি, আমিরাত তাদের নিজস্ব কিছু বিমানঘাঁটিও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল এবং আবুধাবী অঞ্চলটিতে ইসরায়েলি স্বার্থের অগ্রবর্তী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছিল। এর মধ্যে ওমানে এবং অন্তত আরও একটি দেশে “ফলস ফ্ল্যাগ” হামলা চালানোও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেগুলোকে ইরানের কাজ বলে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

ইরান আরও বিশ্বাস করে যে আমিরাতের ডেটা সেন্টারগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য নির্ধারণের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযানে সংযুক্ত আরব আমিরাত যে তার অন্যান্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়ে গিয়ে সমর্থন দিয়েছে, তার পেছনে মূল ব্যক্তি একজনই—দেশটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, যিনি সাধারণত “এমবিজেড” নামে পরিচিত।

স্কটল্যান্ডের পাবলিক স্কুলে শিক্ষিত এই যুবরাজ গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতার যতটা ক্ষতি করেছেন, আমার মনে হয় বেনইয়ামিন নেতানিয়ায়ূ ও মোসাদ ছাড়া আর খুব কম মানুষই তার কাছাকাছি যেতে পারে। তবে এমবিজেডই সম্ভবত তৃতীয় স্থানে সবচেয়ে কাছাকাছি।

এমবিজেড আরব স্প্রিং-কে কার্যত থামিয়ে দেন। তিনি মোহাম্মদ মোরসি—মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট—কে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অর্থায়ন ও সংগঠন করেছিলেন, পরে একই কাজ করেন তিউনিশিয়াতেও।

তিনি লিবিয়া, ইয়েমেন ও সুদান -এর গৃহযুদ্ধে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করেন। তিনি ভাড়াটে স্নাইপার নিয়োগ করেছিলেন, যারা ইয়েমেনের নাগরিক সমাজের ব্যক্তিত্বদের হত্যা করত।

তিনি দারফুরের যুদ্ধাপরাধী হেমেতি ব্রাদার্সদের অর্থ জুগিয়েছেন এবং অস্ত্র দিয়েছেন।

এই যুদ্ধগুলোর কারণে আক্ষরিক অর্থেই লাখো আরব মানুষ দুর্ভোগ পোহালেও এমবিজেডের কাছে তা যেন “হাঁসের গায়ে পানি”। যেমন নেতানিয়াহুর প্রকল্প হলো ইসরায়েলের সীমানা সম্প্রসারণ করা, তেমনি এমবিজেডের পরিকল্পনা হলো তার ক্ষুদ্র আমিরাতকে একটি “ছোট স্পার্টা”-য় পরিণত করা—যার সামরিক ও আর্থিক প্রভাব তার আকারের তুলনায় বহুগুণ বেশি হবে। এমবিজেড তার কৌশল তৈরি করেছিলেন ইসরায়েলকে মডেল হিসেবে ধরে।

ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের সুসংগঠিত ও শক্তিশালী লবির আদলে প্রথম তিনিই একটি প্রভাবশালী লবি গড়ে তোলেন। সেই লবিকে ব্যবহার করে তিনি তখনকার প্রায় অজানা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে এগিয়ে আনেন এবং তাকে ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

এটাই ছিল তৎকালীন শক্তিশালী ক্রাউন প্রিন্স ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন নায়েফ এর পতন ও অপমানের পূর্বশর্ত। সে সময় তিনি সিআইএর রিয়াদের প্রধান ভরসা ছিলেন।

পরবর্তীতে ইয়েমেন ইস্যুতে গুরু ও শিষ্যের মধ্যে সম্পর্ক নাটকীয় ও অপূরণীয়ভাবে ভেঙে যায়। আইদারুস আল-জুবাইদি, যিনি আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্র্যানজিশনাল কাউন্সিল এর নেতা, তাকে ইয়েমেন থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল, কারণ তার বাহিনী সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তের একটি বন্দর দখলের চেষ্টা করে অতিরিক্ত আগ্রাসী হয়ে উঠেছিল।

বর্তমানে সৌদি আরব ও মিশর, সুদান, লিবিয়া ও ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত মিলিশিয়া নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিপক্ষদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

কিন্তু এমবিজেড এমন মানুষ নন, যিনি সহজে পিছু হটবেন। সম্প্রতি আমিরাত ঘোষণা দেয় যে তারা ওপেক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু তেল উৎপাদন কোটার বাধা থেকে মুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল না।

এটি ছিল সৌদি আরবকে সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করার এবং ছয় দশক ধরে কার্যকর থাকা তেল কার্টেলটিকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা।

এমবিজেড আবারও বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে সামনে এগোনোর একমাত্র উপায় হলো তার দুই বৃহত্তম প্রতিবেশী—সৌদি আরব ও ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান আরও কঠোর করা।

এটি দুর্বলতার লক্ষণও হতে পারে, কারণ এর ফলে আবুধাবির তেলের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়বে। পর্যটন, এআই ও শিল্পের মাধ্যমে অর্থনীতি বহুমুখীকরণের আগের সব প্রচেষ্টা কার্যত বাতিল হয়ে যাবে, যা অন্যান্য আমিরাতের কাছে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না—কারণ তারা আবুধাবির মতো এতটা তেলনির্ভর নয়।

মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম, যিনি দুবাইয়ের আমিরও, একজন কবি এবং ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেন।

তবুও তিনি এমন একটি টুইট করেছিলেন যার অর্থ ছিল একটাই—তার প্রেসিডেন্টের প্রতি তীব্র সমালোচনা। তিনি লিখেছিলেন: “এই মাতৃভূমির অন্য কর্মকর্তাদের সফলতার জন্য যে কর্মকর্তা চেষ্টা করে না, সে বিশ্বাসযোগ্য নয়। জনসেবামূলক কাজে ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বার্থপরতা হলো বিশ্বাসভঙ্গ, কারণ মাতৃভূমি অবিভাজ্য।”

রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। সৌদি পোস্টার “কলম্বাস”, যাকে অনেকেই সৌদ আল-কাহতানি বলে মনে করেন—যিনি এমবিএসের মিডিয়া প্রধান—তিনি সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী আব্দুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ এর একটি পুরোনো বক্তব্য পুনরায় পোস্ট করেন। সেখানে বলা হয়েছিল: “যারা তেলের বাজারে জুয়া খেলবে, আমরা তাদের কঠোরভাবে কষ্ট দেব।”

ওপেক থেকে বেরিয়ে আসা এমবিজেডের জন্য বিশাল ঝুঁকি—বিশেষত যখন তার আমিরাত এতটাই দুর্বল, তাদের সশস্ত্র বাহিনী ছোট, বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধাদের ওপর নির্ভরশীল, অর্থনীতি অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল, এবং ট্রাম্প নিজেও একজন মিত্র হিসেবে কতটা অস্থির তা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন।

তেহরানের আঘাত খাওয়ার পরও রিয়াদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে—এমবিজেডের পরবর্তী পদক্ষেপ হবে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি সামরিক চুক্তি ঘোষণা করা।

অঞ্চলের আর কোনো শক্তিই আবুধাবিকে বাস্তবিক অর্থে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। আবুধাবি নিজেও নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়।

বাস্তবে এই সামরিক চুক্তি ইতিমধ্যেই বিদ্যমান। ইসরায়েল “স্পেকট্রো” নামের একটি লেজার ব্যবস্থা পাঠিয়েছে, যা ২০ কিলোমিটার দূর থেকে আসা ড্রোন শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া “আইরন বিম” নামের আরেকটি লেজার সিস্টেম পাঠানো হয়েছে, যা স্বল্পপাল্লার রকেট ও ড্রোনকে বাতাসেই ধ্বংস করে দেয় এবং প্রথমে হেজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় লেবাননে ব্যবহার করা হয়েছিল।

এই সিস্টেম পরিচালনার জন্য ইসরায়েলি কর্মীদেরও আনা হয়েছিল।

এই অভিযানের বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, “মাঠে ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি খুব ছোট পরিসরের নয়।”

লেজার প্রযুক্তির পাশাপাশি ইসরায়েল তাদের আইরন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও আবুধাবি ও দুবাইয়ে পাঠিয়েছে।

ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে বাড়তে থাকা সামরিক সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে ট্র্যাক করা ফ্লাইটের সংখ্যাতেও দেখা যাচ্ছে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটগুলো দেখাচ্ছে যে সংঘাত চলাকালে ইসরায়েলের নেতানিয়াহু ঘাঁটি ও আমিরাতের মধ্যে সামরিক পরিবহন বিমান নিয়মিত যাতায়াত করেছে।

কিন্তু আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তি ঘোষণা করা হলে তা নেতানিয়াহু এবং ভবিষ্যতের যেকোনো ইসরায়েলি নেতাকে দেশের সীমানার বহু বাইরে একটি সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত অবস্থান উপহার দেবে।

কারণ ট্রাম্প যা-ই সিদ্ধান্ত নিন না কেন, ইসরায়েল ইরানে শাসন পরিবর্তনের তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য থেকে সরে আসবে না।

ইসরায়েলের পরিকল্পনায় আমিরাতের ক্রমবর্ধমান প্রকাশ্য সম্পৃক্ততা এমন এক সংঘাতের রেসিপি, যা নিজেই কয়েক দশক স্থায়ী হতে পারে এবং পারস্য উপসাগরের উভয় তীরের যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনকে জন্মের আগেই স্তব্ধ করে দিতে পারে।

সৌদি আরব, কাতার, ওমান, পাকিস্তান এবং তুরস্ক —এই আঞ্চলিক কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর শুধু দাঁড়িয়ে থেকে এসব পরিকল্পনা দেখা উচিত নয়।

এই দেশগুলোর একটি বাস্তব ও জরুরি অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে—একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটের মাধ্যমে ইসরায়েল ও তার আমিরাতি মিত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। আর তা করার সময় এখনই।

JadeWits Technologies Limited
সর্বশেষপঠিতনির্বাচিত

আমরা আমাদের সেবা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করি। আমাদের কুকি নীতির শর্তাবলী জানার জন্য অনুগ্রহ করে এখানে ক্লিক করুন। কুকি ব্যবহারের জন্য আপনি সম্মত হলে, 'সম্মতি দিন' বাটনে ক্লিক করুন।