আওয়ামী ও জাতীয়তাবাদী নির্মূলে জাকার্তা মেথড প্লে-বুক

ইন্দোনেশিয়ার সেরায়ু নদী থেকে বাংলাদেশের তুরাগ

বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর আসছে, ২২ জুন তুরাগে আওয়ামী লীগের লোকজন একটি মিছিল করে। মিছিলের পর থেকেই ৭ জন নিখোঁজ হয়। ৭ জনের মধ্যে ৩ জনের অর্ধগলিত মরদেহ তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোর। এর আগের খবর হচ্ছে, তুলে নিয়ে যাওয়ার পরদিন পুলিশ হেফাজতে যুবক নিহত। এসব খবর বাংলাদেশে এখন নিয়মিত। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিকল্প বয়ান। মূলধারা গণমাধ্যম, যারা সরকারি ভাষ্য প্রকাশ করে, তারা বলেছে, "আশুলিয়ায় তুরাগ নদে ট্রলার থেকে পড়ে নিখোঁজ হওয়া কিশোরের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ"।

২০২৪-এর ৫ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান মিলে ইসলামী সন্ত্রাসী ও মৌলবাদীদের ব্যবহার করে দাঙ্গা বাধিয়ে বাংলাদেশে যে সরকার পরিবর্তন করে, সেটার আসল উদ্দেশ্য ছিল জাকার্তা মেথড। উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪-এর ৫ আগস্ট সশস্ত্র মব মিলিশিয়া দ্বারা গণভবন আক্রমণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করা এবং তাঁর মৃতদেহের প্রকাশ্যে অবমাননা করা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আওয়ামী সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে এলে একটি গৃহযুদ্ধ শুরু করা। পরিকল্পনা ছিল সেই গৃহযুদ্ধে নিহতদের বিচারের নামে গণগ্রেফতার এবং ঘৃণা ছড়িয়ে বন্দী নির্যাতন ও বন্দী গণহত্যা। ধর্মীয় ও মৌলবাদী নির্বোধদের দীর্ঘদিন মগজধোলাই করে, কোনো দল বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়িয়ে ঘৃণা তৈরি করে সুপরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ড ইহুদি ধর্মীয়-রাজনৈতিক কৌশল, ইতালির মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ এবং জার্মান নাৎসি কৌশলের সংমিশ্রণে আমেরিকার সিআইএ-এর একটি রাজনৈতিক নির্মূলের অস্ত্র। ১৯৬৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় যেটাকে সফলভাবে প্রয়োগের পর যার নামকরণ করা হয় "জাকার্তা মেথড"।

জাকার্তা মেথডের এই পুরো কাঠামোকে বলা হয় একটি "প্লে-বুক" বা কৌশল-পুস্তিকা, যা পরে ব্রাজিল, চিলি ও অন্যান্য দেশে অনুরূপ বামপন্থা ও জাতীয়তাবাদ দমনে দক্ষিণপন্থী সামরিক দমন-অভিযানের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়—এ কারণেই বইটির নাম। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান পরিচালিত ইসলামী সন্ত্রাসীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলে এবং পরবর্তীতে নানা কৌশলে দেশে গৃহযুদ্ধ সংঘটিত করতে ব্যর্থ হলেও তারা জাকার্তা মেথড প্লে-বুক ফেলে দেয়নি। জাকার্তা মেথড প্লে-বুকের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মিলিয়ে দেখলেই সেটা পরিষ্কার হবে।

পার্টাই নাসিওনাল ইন্দোনেশিয়া (সংক্ষেপে পিএনআই) ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল। এটি ডাচ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত এবং দেশের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতিতেও বড় ভূমিকা রেখেছে। পিএনআই প্রতিষ্ঠিত হয় ৪ জুলাই ১৯২৭ সালে বান্দুংয়ে। ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্ট আকমেদ সুকার্নো এর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। দলের মূল লক্ষ্য ছিল ডাচ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন, গণ-সংগঠন এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। ১৯২৮ সালে দলটির নাম পরিবর্তন হয় পার্টাই নাসিওনাল ইন্দোনেশিয়াতে এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

পিএনআই এর মূল আদর্শ ছিল ইন্দোনেশিয়ান জাতীয়তাবাদ, বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ, বামপন্থী জাতীয়তাবাদ রক্ষা এবং উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা। সুকার্নোর তত্ত্ব মারহেনিজম ছিল দলের মূল ভিত্তি — যা ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মানুষ (মারহেন)-এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির উপর জোর দেয়। পরবর্তীকালে পাঞ্চশীলার সাথেও যুক্ত হয়। ১৯৪৫ সালে সুকার্নোর নেতৃত্বে স্বাধীনতার পর দলটি পুনর্গঠিত হয়। যেটা স্বাধীন ইন্দোনেশিয়ায় এটি একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে। ১৯৫০-এর দশকে বিভিন্ন কোয়ালিশন সরকারে অংশ নেয় এবং বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী এই দল থেকে আসে। ১৯৫৫ সালের নির্বাচনে PNI উল্লেখযোগ্য ভোট পায়। সুকার্নোর গাইডেড ডেমোক্রেসি (১৯৫৯-১৯৬৫) সময়ে দলটি বামপন্থী কিছু সরকারী নীতি প্রবর্তন করে। 

জাকার্তা মেথড প্লে-বুক:

১৯৬৫ সালের ১ অক্টোবরের পর জেনারেল সুহার্তোর নেতৃত্বে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইন্দোনেশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি পিকেআই ও জাতীয়তাবাদী দল পিএনআই ও সেগুলোর সমর্থকদের নির্মূল করার অভিযান শুরু করে। এতে প্রায় ১০ লাখ ইন্দোনেশীয় মানুষকে হত্যা করা হয় এবং আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষকে বন্দিশিবিরে পাঠানো হয় শুধুমাত্র তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য। সেনাবাহিনীর ভেতরে এই অভিযানের নাম ছিল "নির্মূল অভিযান" (অপারেসি পেনিমপেসান)।

জাকার্তা মেথডের রাজনৈতিক উৎখাতের ভিক্টিম বা শিকারদের শ্রেণীবিভাগ

হত্যাকারী কারা ছিল?

  • সরাসরি সেনাবাহিনী ও পুলিশ (বিশেষত আপিকেএডি প্যারাকমান্ডো)
  • স্থানীয় আধাসামরিক দল, বিশেষত মুসলিম যুব সংগঠনের সশস্ত্র শাখা
  • জাতীয়তাবাদী দল পিএনআই-র সমর্থক ও ভূমি-সংস্কার বিরোধী স্থানীয় গোষ্ঠী
  • সাধারণ গ্রামবাসী, প্রায়ই হুমকির মুখে বাধ্য হয়ে বা প্রতিবেশীর প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে

 

কীভাবে হত্যা করা হত

জাকার্তা মেথড রাজনৈতিক বিশ্বাস-ব্যবস্থা "উৎখাত"-এর নকশা — যেটি সাধারণ হত্যাকান্ড ছিল না

জাকার্তা মেথডের লক্ষ্য ছিল শুধু মানুষ মারা নয়, বরং জাতীয়তাবাদী ও কমিউনিজম নামক মতাদর্শকেই সমাজের শিকড় থেকে উপড়ে ফেলা। এই পরিকল্পনা কয়েকটি স্তরে কাজ করেছিল —

ক) ভাষাগত-প্রতীকী প্রস্তুতি: সেনা কমান্ডাররা জনসভায় ঘোষণা দিতেন যে পিকেআইকে "শিকড় থেকে" নির্মূল করতে হবে; সেনাবাহিনীর পত্রিকায় কার্টুনে একটি গাছ কাটার ছবি প্রকাশ হয়, যার শিকড়ে লেখা ছিল "পিকেআই" এবং ক্যাপশনে লেখা ছিল তাদের শিকড়সহ ধ্বংস করার আহ্বান।

খ) মিথ তৈরি করে গণরোষ জাগানো: সেনাবাহিনী মিথ্যা প্রচার চালায় যে গেরওয়ানি নারীরা জেনারেলদের নগ্ন অবস্থায় নির্যাতন করে যৌনাঙ্গ কেটে ফেলেছিল — যা পরে প্রমাণিত হয় সম্পূর্ণ মিথ্যা (জেনারেলদের অটোপসিতে দেখা যায় তারা গুলিতেই মারা গিয়েছিলেন)। এই মিথই সারা দেশে গণহত্যাকে নৈতিক ন্যায্যতা দেয় (আমদের বিডিআর বিদ্রোহ একই প্রে-বুক অনুসারে হয়েছিল)।

গ) তথ্য-নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমের সহযোগিতা: সব স্বাধীন গণমাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে কেবল সেনা-নিয়ন্ত্রিত প্রচার চালু রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র গোপনে যোগাযোগ-সরঞ্জাম সরবরাহ করে; ভয়েস অব আমেরিকা, বিবিসি ও রেডিও অস্ট্রেলিয়া সেনাবাহিনীর বয়ান প্রচার করে, যা স্থানীয়দের কাছে এই মিথকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

ঘ) প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ — স্মৃতিস্তম্ভ, যাদুঘর, চলচ্চিত্র: সুহার্তো নিহত জেনারেলদের স্মরণে একটি বিশাল স্মারক (মনুমেন প্যানকাসিলা শক্তি) ও জাদুঘর “পেংখিয়ানাটান পিকেআই" ( (কমিউনিস্ট বিশ্বাসঘাতকতা যাদুঘর) তৈরি করেন, কিন্তু লাখো নিহত বেসামরিক মানুষের কোনো স্মারক নেই। একটি তিন ঘণ্টার প্রচারণামূলক চলচ্চিত্র প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় টেলিভিশনে প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয় — এ ধারা বহু বছর অব্যাহত ছিল।

ঙ) আনুগত্য-পরীক্ষা ও রাষ্ট্রহীনতা: বিদেশে থাকা ইন্দোনেশীয়দের সুহার্তো সরকারের প্রতি আনুগত্য-পত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়; স্বাক্ষর না করলে পাসপোর্ট বাতিল করে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া হতো।

চ) প্রজন্মান্তরে কলঙ্ক (জেনারেশনাল স্টিগমা): জাতীয়তাবাদী বিশেষ করে "কমিউনিস্ট" পরিচয়কে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন এটি বংশগত দোষ — অভিযুক্তদের সন্তান-সন্তানদেরও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, বৈষম্যের শিকার ও কখনো কখনো নির্যাতিত করা হতো। দশকের পর দশক ধরে এই পরিবারগুলো চাকরি, বিয়ে ও সমাজে গ্রহণযোগ্যতা থেকে বঞ্চিত থেকেছে।

ছ) আনুষ্ঠানিক ক্ষমা বা সত্য-কমিশনের প্রত্যাখ্যান: আজও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্র এই হত্যাকাণ্ডের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি বা সত্য-অন্বেষণ কমিশন গঠন করেনি — এমনকি ২০১৪ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জোকোউইও সরাসরি ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেছেন।

জ) যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য: ওয়াশিংটনের লক্ষ্য কেবল পিকেআই দলকে দুর্বল করা ছিল না — মার্কিন রাষ্ট্রদূতের একটি তারবার্তায় স্পষ্ট বলা হয়, সেনাবাহিনীর দমন সফল হবে না যতক্ষণ না তারা "কমিউনিজমকে নিজে আক্রমণ করতে রাজি হয়"। সোভিয়েত পত্রিকা প্রাভদাও পরে লিখেছিল যে দক্ষিণপন্থী চক্র শুধু দলকে নয়, ইন্দোনেশিয়া থেকে কমিউনিজমের আদর্শকেই "উৎখাত" করার চেষ্টা করছিল।

এখন মিলিয়ে দেখুন ২০২৪ এর ৫ অগাস্টের পর আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে কি করা হচ্ছে এবং তার পরিণতি কি হতে পারে যদি বাংলাদেশের সকল জাতীয়তাবাদী শক্তি একত্র না হয়। উদ্দেশ্য জাতীয়তাকাদ বিলুপ্ত করে মার্কিন ও পশ্চিমা বিশ্বের গোলামে পরিণত করা।