EN
আরও পড়ুন
রাজনীতি
আওয়ামী ও জাতীয়তাবাদী নির্মূলে জাকার্তা মেথড প্লে-বুক
রাজনীতি
ইন্দোনেশিয়ায় জাকার্তা মেথড শুরুর জন্য হয়েছিল ৩০ সেপ্টেম্বর আন্দোলন
রাজনীতি
রাজনীতি
মনিব আমেরিকা ত্যাজ্য করেছে
মানসিক সমৃদ্ধি ও সম্পর্ক
মুখে জয় বাংলা হাতে ছুরি
JadeWits Technologies Limited
রাজনীতি

প্রোপাগান্ডা, গণহত্যা ও ধামাচাপা: জাকার্তা মেথডের প্লেবুক

২০২৪ এর মাস্টারমাইন্ড পাচ্ছি না, কিন্তু পেয়ে গেছি মাস্টার প্ল্যান

বাংলাদেশের ২০২৪ সালে মার্কিন সরকার পরিবর্তন ঘটার আগে ও পরের অনেক ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আমরা দেখেছি ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রশাসনিক পরিবর্তন। ক্রমে সিভিল প্রশাসনকে খেয়ে ফেলেছে সামরিকায়ন, দেখেছি পুলিশের সামরিকায়ন। দেখেছি সামরিক বাহিনীর ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় উৎপাদন, অর্থনীতি ও কর্পোরেট ব্যবস্থাপনায় ক্রমেই অনুপ্রবেশ। ২০০৭-০৮-এর এক-এগারোর ঘটনায় যেগুলো অধিক গতিপ্রাপ্ত হয়। এই প্রক্রিয়া কখনও থেমে থাকেনি। সাদা চোখে এই বিষয়গুলোকে নিরীহ মনে হলেও এগুলো আসলে মার্কিন সাইঅপ যুদ্ধকৌশল। 

এর সঙ্গে যুক্ত মিথ্যা দোষারোপ ও মৌলবাদের চর্চা। গত দুই যুগ আমরা বিশেষ কিছু স্টেট ও নন-স্টেট অ্যাক্টরের মিথ্যা দোষারোপ ও মৌলবাদের চর্চার মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে এবং আওয়ামী লীগ ও ভারতকে অমানবিকীকরণ বা ডিহিউম্যানাইজ করা, শেখ মুজিব এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের পক্ষে কাজ করা মানুষদের খলনায়কীকরণ বা ভিলিফাই করা—এসব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে দেখেছি। সাদা চোখে এই বিষয়গুলোকে নিরীহ মনে হলেও এগুলোও আসলে মার্কিন সাইঅপ যুদ্ধকৌশল। কোনো দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু করতে গেলে এগুলো তার পূর্বপরিকল্পনা।

এরপর দেখেছি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মবের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করার চেষ্টা, যার লক্ষ্য ছিল দুই যুগের প্রতীক্ষিত সেই গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করা। ভারতের হস্তক্ষেপে এবং আওয়ামী লীগের ধৈর্য ও সহনশীলতায় সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও আমরা দেখছি ধারাবাহিক কিছু ঘটনা, যেগুলো আগেরগুলোর মতোই ইন্দোনেশিয়ার সেপ্টেম্বর ৩০ আন্দোলনের সেই কুখ্যাত জাকার্তা মেথডের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিলে যায়।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পরপরই আমেরিকায় যাদের ২০২৪ সালের আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তারা সম্প্রতি সেই দাবি অস্বীকার করেছে। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি, এই ঘটনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা মেথডের প্লেবুক, যেখানে আমরা দেখি শুধু ২০২৪ সালের আন্দোলন বা দাঙ্গা নয়, তার দুই যুগ আগে থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার বিবরণ। আমরা মাস্টারমাইন্ড পাচ্ছি না, কিন্তু পেয়ে গেছি মাস্টার প্ল্যান। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জন রুসার—ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন প্রেস থেকে ২০২০ সালে প্রকাশিত সমাহিত ইতিহাস: ১৯৬৫-১৯৬৬ সালের কমিউনিস্ট গণহত্যা বইতে যেন ২০২৪ সালের বাংলাদেশের ঘটনারই মাস্টার প্ল্যান লেখা। শুধু পিকেআই-এর স্থলে আওয়ামী লীগ পড়ুন।      

১। ভূমিকা: ঘটনাটি কোথায় ও কেন ঘটেছিল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে দীর্ঘ ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ইন্দোনেশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং সুকার্নো হন তার প্রথম প্রেসিডেন্ট। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই বিশাল দ্বীপরাষ্ট্র—যা জাভা, সুমাত্রা, বালি, সুলাওয়েসির মতো হাজারো দ্বীপ নিয়ে গঠিত—১৯৬০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের এক স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রতে পরিণত হয়েছিল। কারণ তখন ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি, সংক্ষেপে পিকেআই (PKI, Partai Komunis Indonesia), সদস্যসংখ্যার বিচারে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের পরই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টিতে পরিণত হয়েছিল—যদিও ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জোটে যুক্ত ছিল না।

সুকার্নো তখন “গাইডেড ডেমোক্রেসি” (পরিচালিত গণতন্ত্র) নামের একটি শাসনব্যবস্থা চালাতেন, যেখানে তিনি ইন্দোনেশিয় জাতীয়তাবাদ কমিউনিস্ট পিকেআই ও সনাতন সেনাবাহিনী—এই পরস্পর-বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে ক্ষমতায় টিকে থাকতেন। পিকেআই এর বিপুল গণসংগঠন ছিল কৃষক, শ্রমিক ও নারীদের যাদের নারী শাখার নাম ছিল গেরওয়ানি - তাদের মধ্যে, আর সেনাবাহিনী ছিল দেশের সবচেয়ে সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। এই দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতাই ছিল সেই বারুদ, যা ১৯৬৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রাতের একটি ফলস ফ্ল্যাগ সামরিক ষড়যন্ত্রের স্ফুলিঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে ইতিহাসের একটি ভয়াবহতম গণহত্যার রূপ নেয়—যেখানে আনুমানিক দশ লক্ষ বা এক মিলিয়নের বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং পিকেআই সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নিচের আলোচনায় আমরা দেখব কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ গোয়েন্দা সিআইএ, যুক্তারজ্যের বিদেশ গোয়েন্দা এমআই সিক্স এবং অন্যান্য পশ্চিমা গোয়েন্দা ও পররাষ্ট্র দফতরের যোগসাজশে। যারা সবাই জানত কি ঘটতে যাচ্ছে। তারা বিব্রত ছিল না যে তারা দশ লক্ষ মানুষ হত্যা করতে যাচ্ছে, তারা চিন্তিত ছিল যে তারা ব্যর্থ হবে কিনা। ইন্দোনেশিয়ার গৃহযুদ্ধ ও গণহত্যা  কোন স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ ছিল না, বরং পশ্চিমা আন্তর্জাতিক শক্তির বুদ্ধি পরামর্শে ও অর্থ অস্ত্র সহযোগীতায় একটি  সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা ও সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিকল্পিত গৃহযুদ্ধ ও গণহত্যা।

২। সেনাবাহিনীর মৌলবাদীকরণ: অভ্যুত্থানের পূর্ব প্রস্তুতি

ইন্দোনেশিয়ায় ১৯৬৫ সালের গণহত্যা আকস্মিক কিছু ছিল না—বরং ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগ থেকে সেনাবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘ একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও মতাদর্শিক রূপান্তরের ফসল ছিল। অর্থাৎ, অক্টোবরের ঘটনার বহু আগেই সেনাবাহিনী পিকেআই-কে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল।

২.১ টেরিটোরিয়াল কমান্ড: কমিউনিজম-বিরোধী দুর্গ নির্মাণ

১৯৫৭-৫৮ সালে সুমাত্রা ও সুলাওয়েসিতে পিআরআরআই/পেরমেস্তা নামের একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহ দমনের পর সেনাবাহিনী “টেরিটোরিয়াল কমান্ড” নামক একটি কাঠামো তৈরি করে। এর মাধ্যমে সেনা সদস্যরা শুধু ব্যারাকে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের প্রতিটি প্রদেশ, জেলা ও গ্রামে স্থায়ীভাবে অবস্থান নেয়—যাকে আঞ্চলিকভাবে “কোডাম” (প্রাদেশিক সামরিক কমান্ড) ও তার ক্ষুদ্রতর শাখা বলা হতো। আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় সুরক্ষা, কিন্তু সেনা জেনারেলরা নিজেদের মধ্যে ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় স্পষ্টভাবে স্বীকার করতেন যে এর আসল লক্ষ্য ছিল পিকেআই এর গ্রামীণ সাংগঠনিক শক্তির মোকাবিলা করা। সেনাবাহিনীর ১৯৬২ সালের একটি গোপনীয় ম্যানুয়ালে “আন্তর্জাতিক কমিউনিজম”-কে দেশের “শত্রু উপাদান” বলে চিহ্নিত করা হয়। মার্কিন থিংক ট্যাংক র‍্যান্ড কর্পোরেশনের ইন্দোনেশিয়া-বিশ্লেষক গাই পাউকার এই কাঠামোর মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সরাসরি পিকেআই-র সঙ্গে দেশ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা বলে বর্ণনা করেছিলেন। সেনাবাহিনী পিকেআই-র অনুকরণে নিজস্ব গণসংগঠনও তৈরি করে—“বাদান কেরজা সামা” (বিকেএস) নামে শ্রমিক, শিল্পী ও ইসলামি পণ্ডিতদের জন্য পৃথক শাখা, যেগুলো সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে এবং পিকেআই-র মোকাবিলার উদ্দেশ্যেই গঠিত হয়েছিল।

২.২ মার্কিন প্রশিক্ষণ ও “সিভিক অ্যাকশন” কর্মসূচি

এই প্রতিষ্ঠানিক প্রস্তুতিতে যুক্তরাষ্ট্রও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ১৯৬৩ সালে ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনী “সিভিক অ্যাকশন” নামে একটি কর্মসূচি চালু করে, যেখানে সেনা সদস্যরা সড়ক নির্মাণ ও জলসেচের মতো অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত হতো - এগুলো আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কাজ, কিন্তু এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী সিভিল সমাজ ও গ্রামীণ জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে পিকেআই-র প্রভাব হ্রাস করতে চেয়েছিল। দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও লাতিন আমেরিকায় নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই কর্মসূচিতে পরামর্শ ও তত্ত্বাবধান প্রদান করে। র‍্যান্ড কর্পোরেশনের গাই পাউকার এবং জাকার্তায় নিযুক্ত মার্কিন সামরিক অ্যাটাশে জর্জ বেনসন এই কর্মসূচির মূল উপদেষ্টা ছিলেন, এবং তাঁদের প্রধান যোগাযোগ-ব্যক্তি ছিলেন বান্দুংয়ের সেনা স্টাফ কলেজের উপ-প্রধান কর্নেল সুওয়ার্তো।

২.৩ সেনা স্টাফ কলেজ: সেনা থিংক ট্যাংক ও জেনারেল ইয়ানির গোপন প্রতিশ্রুতি

১০ লক্ষ মানুষ হত্যার নায়ক ইন্দোনেশিয়াকে মর্কিন ও পশ্চিমাদের করে দেয়া কর্নেল সুহার্তোই বান্দুংয়ের সেনা স্টাফ কলেজ (SESKOAD)-এ একটি গোপন চিন্তা-চর্চার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, যা কার্যত সেনাবাহিনীর প্রকৃত থিংক ট্যাংকে পরিণত হয়। এখানে কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে পিকেআই-মোকাবিলার কৌশল নিয়ে নিয়মিত চর্চা করতেন। এই গোপন প্রস্তুতির গভীরতা বোঝা যায় একটি ঘটনা থেকে: ১৯৬৪ সালে এই কলেজে প্রশিক্ষণরত এক অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তা কর্নেল ইস্ট-কে সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়ানি ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন যে সেনাবাহিনীর কাছে পিকেআইকে “নিশ্চিহ্ন” করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে, যা “সময় উপযুক্ত হলে” কার্যকর করা হবে। কর্নেল ইস্টের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে দেখা যায় যে ইয়ানি স্রেফ মুখের কথা বলেননি - সেনাবাহিনী বাস্তবিকই দেশজুড়ে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে কোনো কমিউনিস্ট ক্ষমতা দখলের চেষ্টা রোধ করতে সক্ষম ছিল। অর্থাৎ অক্টোবরের ঘটনার বেশ আগে থেকেই সেনা নেতৃত্ব আদর্শগতভাবে যুদ্ধ-প্রস্তুত ও মানসিকভাবে মৌলবাদী হয়ে উঠেছিল - সেপ্টেম্বর ৩০ আন্দোলন কেবল তাদের জন্য একটি প্রতীক্ষিত অজুহাত সরবরাহ করেছিল মাত্র।

২.৪ পিকেআই এর প্রতিকৌশল: সেনাবাহিনীর অন্দরে অনুপ্রবেশ

সেনাবাহিনীর এই প্রস্তুতি সম্পর্কে পিকেআই সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল না। দলীয় প্রধান আইদিত জানতেন যে টেরিটোরিয়াল কমান্ড পার্টিকে শ্বাসরোধ করার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু তিনি এর বিলোপের প্রকাশ্য দাবি তোলেননি। বরং পার্টি “এমকেটিবিপি” (তিন ধরনের সংগ্রাম সমন্বয় পদ্ধতি) নামক একটি গোপন কৌশল অনুসরণ করে, যাতে কৃষক ও শ্রমিকদের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও গোপনে সমর্থক তৈরির কাজ চালানো হতো। এই কাজের তত্ত্বাবধান করত আইদিতের নিজস্ব “স্পেশাল বুরো” (গোপন ব্যুরো)। কিন্তু পিকেআই নেতারা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ডের শক্তি ভুল বিচার করেছিলেন। সংকটের মুহূর্তে সেনাবাহিনীর ভেতরের সমর্থকরা কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও, যেমন সিআইএ, এনএসএ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে এক যৌথ মূল্যায়নে উপসংহার টেনেছিল যে সুকার্নোর মৃত্যু হলেও সেনাবাহিনী কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি নিতে “সম্ভবত অনিচ্ছুক” হবে। যেটা একটি পূর্বাভাস যা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়।

২.৫ গণমাধ্যমের জন্য পূর্ব-প্রস্তুতি

শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, অক্টোবরের অনেক আগেই সেনাবাহিনী গণমাধ্যম-যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুকার্নো ১৯৬৫ সালের প্রথমার্ধে এক দমন-অভিযানে অসংখ্য কমিউনিস্ট-বিরোধী সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার পর সেনাবাহিনী আতঙ্কিত হয়ে নিজস্ব দুটি দৈনিক, বেরিতা যুধা (ফেব্রুয়ারি ৯) ও আংকাতান বারসেনজাতা (মার্চ ১৫) চালু করে। একই সময়ে জেনারেল ইয়ানি ক্যাথলিক এলিটদের কোম্পাস পত্রিকা প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দেন, যাতে পিকেআই-বিরোধী একটি প্রতিষ্ঠিত কণ্ঠস্বর তৈরি হয়। এভাবে অক্টোবরের আগেই সেনাবাহিনীর হাতে এমন একটি প্রচারযন্ত্র প্রস্তুত ছিল, যা ঘটনার পরপরই সম্পূর্ণ ক্ষমতায় কাজে নেমে পড়তে পেরেছিল। সামরিক, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম - এই তিন ক্ষেত্রেই প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হওয়ার পরই সেই রাতটি আসে, যা ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দেয়।

৩। সেপ্টেম্বর ৩০ আন্দোলন: ঘটনাপ্রবাহ

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখেছি কীভাবে সেনাবাহিনী বছরের পর বছর ধরে পিকেআই-বিরোধী একটি সংস্কৃতি ও সমর যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। এই উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটেই ১৯৬৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা সেই সংস্কৃতি ও সমর যন্ত্রকে সক্রিয় করার অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়।

৩.১ রাতের অভিযান, জেনারেল হত্যা ও রেডিও দখল

১৯৬৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল উনতুংয়ের নামসর্বস্ব নেতৃত্বে একটি নিম্ন পদমর্যাদার ক্ষুদ্র সামরিক গোষ্ঠী, যারা পিকেআই-র গোপন “স্পেশাল বুরো” কর্তৃক সংগঠিত হয়েছিল বলে প্রচার করা হয়, তারা ছয়জন শীর্ষ জেনারেলকে (জেনারেল ইয়ানি সহ) তাঁদের নিজ বাসা থেকে অপহরণের চেষ্টা করে। অভিযানটি তাদের পরিকল্পনামতো এগোয়নি। সেই ছয়জন জেনারলই হত্যার শিকার হন, এবং তাঁদের দেহ জাকার্তার উপকণ্ঠে একটি কুয়োয় ফেলে দেওয়া হয়, যে স্থানের নাম ছিল লুবাং বুয়াইয়া (অর্থাৎ “কুমিরের গর্ত”)। ঘটনাটির নামকরণ পরবর্তীতে করা হয় “সেপ্টেম্বর ৩০ আন্দোলন” (G30S) নামে। সকালে আন্দোলনের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় রেডিও স্টেশন আরআরআই দখল করে এবং একটি “জেনারেলদের কাউন্সিল”-এর বিরুদ্ধে সুকার্নোকে রক্ষা করার দাবিতে একটি বিবৃতি প্রচার করে। যদিও বাস্তবে এমন কোনো অভ্যুত্থানকারী কাউন্সিলের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি। আসলে এই পুরো ঘটনাটিই ছিল একটি ফলস ফ্ল্যাগ। যাতে প্রেসিডেন্ট সুকার্নোর ভক্ত পিকেআই সমর্থিত সেনারা ছয় জেনারেলকে হত্যা করেছে বলে সেনাবাহিনীকে ক্ষুব্ধ এবং জনগণকে সন্ত্রস্ত করা যায়। এর সাথে পিকেআইকে ডিমনাইজ করার বহুবিধ পূর্ব পরিকল্পিত গুজবকে ছড়িয়ে দেয়া যায়।   

৩.২ আন্দোলনের আকস্মিক পতন

নাটকীয়ভাবে, এই “ষড়যন্ত্র” যতটা ভয়াবহ শোনায়, বাস্তবে তা ছিল তার চেয়ে বহু গুণ দুর্বল ও বিক্ষিপ্ত। সেনাদের এই প্রচেষ্টা কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। মেজর জেনারেল সুহার্তো—যিনি সেই রাতে অপহরণের তালিকায় ছিলেন না এবং নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখেছিলেন—দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই রেডিও স্টেশন আরআরআই পুনরুদ্ধার করেন। তখন আন্দোলনের সমর্থকরা ইতিমধ্যে বহু আগেই স্থান ত্যাগ করেছিল। সেনাবাহিনীর তথ্য বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইবনু সুবরোতো শান্তভাবে স্টেশনে প্রবেশ করে ঘোষণা দেন যে এই প্রচেষ্টা “প্রতিবিপ্লবী”। একই সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী সমস্ত সংবাদপত্র ছাপাখানা দখলের নির্দেশ জারি করে—যা পরবর্তী মাসগুলোর প্রোপাগান্ডা অভিযানের প্রথম পদক্ষেপ ছিল।

৩.৩ সুরাকার্তায় সমান্তরাল ঘটনা: একটি স্থানীয় দৃষ্টান্ত

জাকার্তার বাইরে অন্যান্য শহরেও এই প্রচেষ্টার প্রতিধ্বনি ঘটেছিল, যা একই ধরনের বিক্ষিপ্ততা ও পরিকল্পনার অভাব প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকার নেওয়া এক প্রাক্তন সার্জেন্ট ব্রন্তো বর্ণনা করেন যে কীভাবে মধ্য জাভার শহর সুরাকার্তায় একই রাতে স্থানীয় “স্পেশাল বুরো” সদস্যরা সেনা কর্মকর্তাদের একটি ক্ষুদ্র দলকে সংগঠিত করে এবং তাদের সিক্সথ ব্রিগেড কমান্ডার ও কোডিম (জেলা সামরিক কমান্ড) প্রধানকে অপহরণ করায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় “স্পেশাল বুরো” থেকে আর কোনো নির্দেশনা না আসায় তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং ৩ অক্টোবর নিজেরাই অভিযান প্রত্যাহার করে বন্দিদের মুক্তি দেয় - কোনো রক্তপাত ছাড়াই। এই বিবরণ স্পষ্ট করে দেয় যে আন্দোলনটি জাকার্তা ও মধ্য জাভায় একই রকম সীমিত, এবং যেটার কোন মালিক নেই। সেই সময় মনে করা হয় এটি বিক্ষিপ্ত ও দ্রুত-পরিত্যক্ত একটি ক্ষুদ্র ষড়যন্ত্র ছিল - জাতীয় পর্যায়ের কোনো গণবিদ্রোহ মোটেও ছিল না।

৩.৪ সুহার্তোর প্রতিক্রিয়া ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস

জেনারেলদের হত্যাকান্ডের পেছনে কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। সেটা সত্ত্বেও তার প্রভাব হয়ে ওঠে সুদূরপ্রসারী, কারণ সুহার্তো এই সংকটকে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে কাজে লাগান। তিনি সুকার্নোর পছন্দের সেনাপ্রধান-প্রার্থী জেনারেল প্রানোতোর নিয়োগ ভেটো দিয়ে আটকান এবং নিজেই সেনাপ্রধানের পদ দখল করেন। ছয় জেনারেলের হত্যার পর সেনা অভিজাতরাও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে চলার সিদ্ধান্ত নেয়। সুকার্নো শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে এই সংকটকে একটি ছোটখাটো ঘটনা হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন এবং কোনো প্রতিশোধমূলক সহিংসতা থেকে সবাইকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেনাবাহিনী গণমাধ্যমের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে তাঁর আদেশ অমান্য করে নিজস্ব প্রচারণা শুরু করে দেয়। ঠিক এই বিন্দু থেকেই—যেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে সেনাবাহিনীর বয়ান প্রাধান্য পেতে শুরু করে—আমাদের পরের আলোচনার সূত্রপাত: কীভাবে এই বয়ানকে একটি সুসংগঠিত প্রোপাগান্ডা অভিযানে রূপান্তরিত করা হয়েছিল।

৪। প্রোপাগান্ডার কৌশল ও কারিগরি

৪.১ গণমাধ্যম দখল ও সুকার্নোর কণ্ঠরোধ

অক্টোবর ১-এর পর সেনাবাহিনী রেডিও ও সংবাদপত্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। সুকার্নোর বক্তব্য সংবাদে আংশিকভাবে উদ্ধৃত করা হতো, এবং সেনা-নিয়ন্ত্রিত আনতারা বার্তা সংস্থা ও সেনাবাহিনীর নিজস্ব দুটি দৈনিক—বেরিতা যুধা ও আংকাতান বারসেনজাতা—হয়ে ওঠে প্রচারণার মূল বাহন। বেসরকারি সংবাদপত্র যেমন কোম্পাসও মূলত এই সরকারি সূত্রগুলোর খবরই পুনঃপ্রকাশ করত। ফলে সুকার্নো, যিনি নিজেকে “জনগণের কণ্ঠস্বর” বলে দাবি করতেন, কার্যত নিঃশব্দ হয়ে পড়েন এবং দেশজুড়ে একমাত্র বয়ান হিসেবে রয়ে যায় সেনাবাহিনীর বয়ানই।

৪.২ চারটি মূল কৌশলগত স্তম্ভ: বিস্তারিত বিশ্লেষণ

এই একচ্ছত্র গণমাধ্যম-নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনী যে প্রচারণা চালায়, তা ছিল উদ্দেশ্যমূলক, ব্যপক মনেজাগতিক মেধা, চিন্তাভাবনা ও কঠোর শ্রমের ফসল। মিথ্যা কাহিনি রচনা করতে যেমন কল্পনাশক্তি প্রয়োজন হয়েছিল, তেমনই তা ছড়িয়ে দিতে দরকার হয়েছিল বিপুল সাংগঠনিক প্রচেষ্টা। এই প্রচারণার পদ্ধতিগত কাঠামো বুঝতে চারটি মূল থিমে এর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিটি থিমেরই সুনির্দিষ্ট প্রটোকল, নির্দিষ্ট ভাষাশৈলী এবং বিশেষভাবে বেছে নেওয়া উদাহরণ ছিল, এবং এই চারটি একসঙ্গে মিলেই সাধারণ মানুষকে গণহত্যায় অংশগ্রহণে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে।

স্তম্ভ ১: সমষ্টিগত অপরাধ আরোপ (Collective Guilt)

প্রথম স্তম্ভটির লক্ষ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র ষড়যন্ত্রের দায় লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। শুরুতে সেনা-সংবাদপত্র কেবল উল্লেখ করেছিল যে বাম-সংবাদপত্র হারিয়ান রাকজাত আন্দোলনের (জেনারেলদের হত্যা) প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। অক্টোবর ৫ তারিখে প্রথমবার পিকেআইকে “দালাং” (পুতুলনাচের কারিগর, অর্থাৎ পেছন থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণকারী) হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় যখন ‘অ্যাকশন ফ্রন্ট টু ক্রাশ দ্য সেপ্টেম্বর ৩০ কাউন্টার-রেভোলুশনারি মুভমেন্ট, কেএপি-গেস্তাপু’ নামে একটি নতুন ভূঁইফোড় সংগঠন আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি তোলে। এই ফ্রন্ট দেখতে বেসামরিক উদ্যোগের মতো হলেও কার্যত সেনাবাহিনীর সৃষ্টি ছিল। সুকার্নোর অধীন সর্বোচ্চ অপারেশন কমান্ড কোটির রাজনৈতিক শাখার প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুতজিপতো আন্দোলনের পতনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় ইসলামি গণসংগঠন এনইউ (Nahdlatul Ulama,) নেতা সুবচান যেড.ই. ও ক্যাথলিক পার্টির হ্যারি জান সিলালাহি-কে নিয়ে এই ফ্রন্ট গঠন করেন। অক্টোবর ৮ তারিখে একদল জনতা জাকার্তায় পিকেআই-র জাতীয় সদর দফতরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেনা-সংবাদপত্র এটিকে “স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ” বলে প্রচার করলেও বাস্তবে সেনাবাহিনী রাস্তা ঘিরে রেখে বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষা দিয়েছিল। এরপর দেশজুড়ে সংবাদপত্রে “গোপন দলিল আবিষ্কার”-এর কাহিনি ছড়াতে থাকে। যেখানে হত্যার তালিকা (ব্ল্যাক লিস্ট), কোডেড বার্তা, এবং “ব্ল্যাক ক্যাট ট্রুপস”-এর মতো কাল্পনিক গোপন বাহিনীর নানা বানোয়াট কাহিনি তৈরি করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রমাণ করা যে লক্ষ লক্ষ সাধারণ সদস্যও এই জেনারেল হত্যা ষড়যন্ত্রে জ্ঞাতসারে যুক্ত ছিল। সুহার্তো-আমলের জাতীয় প্রতিরক্ষা ইনস্টিটিউট লেমহানাস এর প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে এই যৌথ-অপরাধ তত্ত্বকে আইনি ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়: পিকেআই-র প্রতিটি সদস্যকেই “সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত” বলে গণ্য করা হতো, এমনকি যদিও তারা ঘটনার কথা জানতই না।

স্তম্ভ ২: অমানবিকীকরণ (Dehumanization)

দায় চাপানোর পর দ্বিতীয় স্তম্ভের কাজ ছিল সেই অভিযুক্তদের মানুষ হিসেবে আর গণ্য না করা। কারণ একবার কাউকে “অমানুষ” বলে মনে করা শুরু হলে তার বিরুদ্ধে সহিংসতা বা তাদের হত্যা সহজ হয়ে পড়ে। পিকেআই সমর্থকদের “বর্বর” (orang biadab) ও “হিংস্র পশু” (hewan ganas) হিসেবে চিত্রিত করা হতো। রটনা করা হত যারা নির্যাতনে যৌন আনন্দ পায় এবং যাদের নৈতিকতার কোনো বোধ নেই। এই অমানবিকীকরণের সবচেয়ে কুখ্যাত রূপ ছিল প্রচারণা-প্রধান জেনারেল সুগান্দির রচিত পিকেআই-সংযুক্ত নারী সংগঠন গেরওয়ানির বিরুদ্ধে। এমন যৌন কুৎসা প্রচার করা হয় যে গেরওয়ানি নারীরা নিহত জেনারেলদের যৌনাঙ্গ স্পর্শ করেছে, নিজেদের শরীর প্রদর্শন করেছে, এবং এমনকি পরবর্তী সংস্করণে আটক কিশোরীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা “স্বীকারোক্তি”-র ভিত্তিতে ক্ষুর দিয়ে দেহ কেটে নগ্ন নৃত্য করার কাহিনিও প্রচারিত হয়। সুকার্নো নিজে একটি মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই কাহিনিকে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতে ভিত্তিহীন বলে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন, কিন্তু আংকাতান বারসেনজাতা ও আনতারা তাঁর নির্দেশ অমান্য করে আরও উদ্ভট কাহিনি প্রকাশ করতে থাকে। অমানবিকীকরণের আরেকটি অস্ত্র ছিল চোখ-উপড়ানোর কাহিনি। রাবার-চাঁছার সাধারণ ছুরিকেও “বিশেষভাবে তৈরি চোখ-উপড়ানোর যন্ত্র” বলে প্রচার করা হয়। এই কৌশলগুলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল একটি বর্ণনা প্রতিষ্ঠা করা যে পিকেআই সমর্থকরা “ইন্দোনেশিয়ায় বসবাসের অধিকার হারিয়েছে”—অর্থাৎ তাদের হত্যা করা মানুষ হত্যা নয়, বরং হিংস্র জন্তু নিধন।

স্তম্ভ ৩: চলমান হুমকি (Ongoing Threats)

তৃতীয় স্তম্ভের কাজ ছিল সময়ের ব্যবধান মুছে ফেলা। যেন বিপদ এখনও বিদ্যমান, এবং এখনই প্রতিরোধ না করলে আরও বড় বিপর্যয় ঘটবে। বাস্তবে সেপ্টেম্বর ৩০ আন্দোলন জাকার্তায় একদিনের কম এবং মধ্য জাভার কিছু শহরে কেবল তিন দিন স্থায়ী ছিল। কিন্তু প্রচারণা এমনভাবে চালানো হয় যেন এই আন্দোলন কখনও শেষ হয়নি। পিকেইআই রাষ্ট্রবিরোধীতা ও তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এমন প্রচার চালিয়ে যাওয়া। মধ্য জাভাকে “যুদ্ধাবস্থা” বলে ঘোষণা করা হয়, যদিও বাস্তবে সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো রেজিমেন্ট আরপিকেএডি বাহিনী অক্টোবর ১৭ তারিখে প্রবেশের আগে তিন সপ্তাহ ধরে প্রদেশটি সম্পূর্ণ শান্ত ছিল। বানিউওয়াঙ্গির চেমেতুক গ্রামে এক কাল্পনিক “বিষ-প্রয়োগ গণহত্যা”-র কাহিনি প্রচারিত হয়। দাবি করা হয় পিকেআই সমর্থকরা ৬২ জন এনইউ সদস্যকে আতিথেয়তার ছলে বিষ মিশ্রিত খাবার খাইয়ে হত্যা করেছিল। বাস্তবে ঘটেছিল ঠিক বিপরীত—একটি পরাজিত এনইউ আক্রমণকারী দলকে গ্রামবাসীরা আত্মরক্ষার্থে হত্যা করে, এবং তার “প্রতিশোধ” হিসেবে সেনাবাহিনী গ্রামটির ওপর দ্বিতীয় গণহত্যা চালায়। যা প্রচারণায় উল্লেখই করা হয়নি। অনুরূপ বিষ-প্রয়োগের কাহিনি সুরাবায়া ও জাকার্তার পানির লাইন নিয়েও ছড়ানো হয়। এসব কাহিনির মূল উদ্দেশ্য ছিল “আগে মারো, নয়তো মরবে” (kill or be killed) এমন একটি আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করা, যাতে সাধারণ মানুষ সহিংসতাকে আত্মরক্ষা বলে ভাবতে শুরু করে।

স্তম্ভ ৪: অতীত হুমকি (Past Threats)

চতুর্থ স্তম্ভটি বর্তমান হুমকিকে অতীতের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে এমন একটি ধারণা তৈরি করে যে পিকেআই বরাবরই বিশ্বাসঘাতক, এবারই প্রথম নয়। সেপ্টেম্বর ৩০ আন্দোলনকে ১৯৪৮ সালের মাদিউন বিদ্রোহের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখানো হয়। সেটাকে “দ্বিতীয় মাদিউন” বলে অভিহিত করে প্রচার চালানো হয় “তৃতীয় মাদিউন যেন আর না ঘটে।” বাস্তবে ঐতিহাসিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের গবেষণা দেখায় যে মাদিউন বিদ্রোহে উভয় পক্ষই নৃশংসতা চালিয়েছিল এবং পিকেআই নেতৃত্ব নিজেই সেই বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করেননি, বরং বহু পিকেআই নেতাকেও সরকারি বাহিনী মাদিউনের পর গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল যেমন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির সাজারিফউদ্দিন। কিন্তু ১৯৬৫ সালের পর একটি প্রাক্তন ইসলামি রাজনৈতিক দল এনইউ ও মাসজুমির পক্ষ থেকে সেনা-উৎসাহে ব্যাপক সাহিত্য প্রকাশিত হয় যা পিকেআইকে এক চিরন্তন “জাতীয় বিশ্বাসঘাতক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে মিলে এমন একটি মানসিক বাতাবরণ তৈরি করে, যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে সহিংসতাই একমাত্র যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া বলে মনে হতে শুরু করে।

৪.৩ “অপারাসি মেন্টাল”: প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রচারণা

কিন্তু সংবাদপত্র ও রেডিও কেবল শহরাঞ্চলের শিক্ষিত মানুষদের কাছে পৌঁচ্ছাতে পারত। দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলে, যেখানে অনেকেই নিরক্ষর ছিল, প্রচারণা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী “অপারাসি মেন্টাল” (মানসিক অভিযান) নামে বিশেষ দল গঠন করে, যারা মেগাফোন নিয়ে সরাসরি গ্রামে গিয়ে মুখে-মুখে পিকেআই-বিরোধী বার্তা পৌঁচ্ছে দিত। পূর্ব জাভায় এই কর্মসূচি পরিচিত ছিল “বিনা মেন্টাল” নামে। এভাবে প্রচারণার জাল এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছিল যে দেশের কোনো প্রান্তেই এই বয়ান এড়িয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। তবে কেবল ভয় ও মিথ্যা তথ্য দিয়েই সেনাবাহিনী সন্তুষ্ট ছিল না, তারা এই প্রচারণাকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করতে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মকেও কাজে লাগিয়েছিল। এই প্রচারণার জন্য ইন্দোনেশিও সেনাবাহিনীর কাছে মার্কিন সরকার থেকে বিশেষ রেডিও স্টেশন সরবরাহ করা হয়।

৫। ধর্মকে রাজনৈতিক-সামরিক হাতিয়ার রূপে ব্যবহার
অত্যন্ত ধর্মভিত্তিক ইন্দোনেশীয় সমাজে নিছক রাজনৈতিক প্রচারণার চেয়ে ধর্মীয় আবেদন বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। সেনাবাহিনী এই বাস্তবতা বুঝেই প্রোপাগান্ডার চারটি স্তম্ভের পাশাপাশি ধর্মকেও একটি সমান্তরাল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

৫.১ নাস্তিকতার অভিযোগ: পিকেআইকে “ধর্মীয় গোষ্ঠী”-বিরোধী রূপে চিত্রায়ন

সেনা-প্রচারণা পিকেআই সমর্থকদের নৈতিক অধঃপতনের মূল কারণ হিসেবে তাদের নাস্তিকতাকে চিহ্নিত করে। একটি ব্যানার শিরোনাম ঘোষণা করেছিল, “যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না তারা মানুষ নয়।” অন্য শিরোনামে বলা হয়, “আল্লাহকে অবিশ্বাস মানুষকে শয়তানের শিকারে পরিণত করে” এবং “আল্লাহকে অবিশ্বাস করা মানুষ পশুর চেয়েও বর্বর।” ইতিহাসবিদ জেস মেলভিন যুক্তি দেখিয়েছেন যে এই কারণেই পিকেআইকে জাতিসংঘ গণহত্যা সনদের অর্থে একটি “ধর্মীয় গোষ্ঠী” হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে—কারণ ভুক্তভোগীদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল তাদের ধর্মহীনতার অভিযোগে, যা অমানবিকীকরণের স্তম্ভের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

৫.২ সেনা নেতৃত্বের ধর্মীয় বক্তব্য

এই নাস্তিকতার অভিযোগ কেবল সংবাদপত্রের শিরোনামেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে এই ভাষায় কথা বলতেন। আচেহ ও উত্তর সুমাত্রার গণহত্যা পরিচালনাকারী মেজর জেনারেল মোকোগিন্তা মেদানে এক খ্রিস্টান সমাবেশে ঘোষণা করেছিলেন, “ঈশ্বর-বিশ্বাসী দেশে ঈশ্বর-বিরোধীদের বসবাসের অনুমতি দেন না।” সুহার্তো নিজে এক খ্রিস্টান প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতে বলেছিলেন যে সেপ্টেম্বর ৩০ আন্দোলন স্পষ্টত “ঈশ্বর-বিরোধী” ছিল এবং পানচাসিলা-ভিত্তিক (ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় পাঁচ নীতি, যার একটি স্তম্ভ ঐশ্বরিক বিশ্বাস) দেশে তার লেশমাত্র অবশিষ্ট রাখা উচিত নয়। এভাবে গণহত্যাকে একটি ধর্মীয়-নৈতিক কর্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা নিছক রাজনৈতিক অভিযানের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিরোধ-প্রতিরোধী জনসমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়।

৫.৩ ধর্মীয় সংগঠনের সামরিকীকরণ: সারওয়ো এদি ও “কিল অর বি কিল্ড”

এই ধর্মীয় বক্তব্য থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা। মধ্য জাভায় আরপিকেএডি কমান্ডার সারওয়ো এদি সুরাকার্তা এলাকার একটি আধুনিকতাবাদী ইসলামি সংগঠন মুহাম্মদিয়াহ ও এনইউ-সংশ্লিষ্ট যুব সংগঠনগুলোর নেতাদের ডেকে এনে দুই-তিন দিনের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে “কমিউনিস্ট নিধনে” পাঠিয়ে দেন। তাঁর নিজের ভাষায়: “আমরা যুবক, জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে একত্র করেছি, দুই-তিন দিনের প্রশিক্ষণ দিয়েছি, তারপর তাদের কমিউনিস্ট হত্যা করতে পাঠিয়েছি।” সেনাবাহিনীর কাছে এই সংগঠনগুলোর হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের হত্যার “লাইসেন্স” ও দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া। ধর্মীয় নেতারা এই অভিযানকে “কিল অর বি কিল্ড” (membunuh atau dibunuh) যুক্তিতে ন্যায্যতা দিতেন। যদিও প্রকৃতপক্ষে কোনো সশস্ত্র পিকেআই আক্রমণ কখনও ঘটেনি।

৫.৪ “বানসের বেরজিহাদ”: গণহত্যাকে জিহাদ হিসেবে জায়েজিকরণ

পূর্ব জাভায় এই ধর্মীয় সংগঠনের ব্যবহার সবচেয়ে চরম রূপ নেয়। এনইউ-র যুব শাখা বানসের সেখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয়, এবং তারা এই ভূমিকাকে গোপন করার বদলে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করে। ১৯৯৬ সালে এনইউ প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের শিরোনামই ছিল “বানসের বেরজিহাদ: মেনুমপাস পিকেআই”। যার অর্থ বানসেরের জিহাদ: পিকেআই নিশ্চিহ্নকরণ। অর্থাৎ এই হত্যাকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে একটি ধর্মীয় জিহাদ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। বইটিতে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে বানসের সদস্যরা সেনা-কমান্ডারের নির্দেশে ছয় হাজার আটককৃত ব্যক্তিকে একটি মাঠে জমা করে রাখত এবং প্রতি রাতে তার মধ্য থেকে ত্রিশ-চল্লিশ জনকে কাছের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে “নিধন” (disembelih, কোরবানির পশুর মতো জবাই) করত। সাংবাদিক স্ট্যানলি কারনো লিখেছিলেন যে পূর্ব জাভার কারাগার মধ্য জাভার চেয়ে বেশি খালি ছিল কারণ অনেক কম বন্দিকেই জীবিত রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

৫.৫ বালিতে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক মাত্রা

হিন্দু-প্রধান বালিতে ধর্মীয় ফ্রেমিং কিছুটা ভিন্ন রূপ নেয়। এখানে পিএনআই (Partai Nasional Indonesia, সুকার্নোর নিজের জাতীয়তাবাদী দল)-নিয়ন্ত্রিত “তামেং” মিলিশিয়া পিকেআইকে সরাসরি ধর্মদ্রোহী না বলে রাজবংশীয় ও সামাজিক মর্যাদার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আক্রমণ করে। তবে এখানেও মৃতদের সৎকার-প্রথা নিয়ে গভীর আধ্যাত্মিক উদ্বেগ পরিলক্ষিত হয়। এমনকি অপরাধে অংশ নেওয়া স্থানীয় নেতারাও পরবর্তী জীবনে নিজ মৃত্যুর পর দাহ-সৎকারের পরিবর্তে কবরস্থ হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যা এক প্রকার নিজ-অপরাধের সঙ্গে আধ্যাত্মিক রকমের সমঝোতার প্রচেষ্টা হিসেবে। এই ধর্মীয় ও মানসিক প্রস্তুতির পরই আমরা পৌঁছাই সেই পর্যায়ে, যেখানে প্রচারণা ও বিশ্বাস বাস্তব নৃশংসতায় রূপ নেয়।

৬। বাস্তবায়ন: নৃশংসতার প্রকৃত প্রয়োগ
প্রোপাগান্ডা ও ধর্মীয় উদ্বুদ্ধকরণ একসঙ্গে মানুষকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার পর, সেনাবাহিনী একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই প্রস্তুতিকে বাস্তব হত্যাকাণ্ডে রূপান্তরিত করে।

৬.১ আটক ও শ্রেণীবিভাগ ব্যবস্থা

সর্বোচ্চ অপারেশন কমান্ড (কোটি) আটক ব্যক্তিদের শ্রেণীবদ্ধ করার জন্য কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক জিজ্ঞাসাবাদ দল (তেপারপু/তেপারদা) গঠন করে, যারা বন্দিদের “এ” (সরাসরি জড়িত), “বি” (পরোক্ষভাবে জড়িত) এবং “সি” (জড়িত থাকার সন্দেহ) শ্রেণিতে ভাগ করত। বাস্তবে এই “পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা” ধারণাটি এতটাই বিস্তৃত ছিল যে নিছক পিকেআই বা তার অঙ্গসংগঠনের সদস্য হওয়াই যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতো। অর্থাৎ ব্যবস্থাটি তৈরিই হয়েছিল যত বেশি সম্ভব মানুষকে সন্দেহভাজনের তালিকায় রাখার জন্য।

৬.২ নির্যাতনের মাধ্যমে “সত্য” তৈরি

একবার আটক হলে বন্দিদের ভাগ্য নির্ধারিত হতো জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে। জাকার্তার একটি পরিত্যক্ত চলচ্চিত্র স্টুডিও (ইনফিকো)-কে সেনাবাহিনী জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে রূপান্তরিত করে, যেখানে কাঠ ও তারের জাল দিয়ে তৈরি খাঁচায় বন্দিদের রাখা হতো এবং নিয়মিতভাবে নির্যাতন চালানো হতো। এই নির্যাতন প্রকৃত তথ্য আদায়ের জন্য করা হতো না। বরং তা ছিল সেনাবাহিনীর নিজেরই তৈরি কাল্পনিক বিদ্রোহের কাহিনিকে “নিশ্চিত” করার একটি প্রক্রিয়া। বন্দিদের জোর করে এমন স্বীকারোক্তি আদায় করা হতো, যা প্রচারণার বয়ানের সঙ্গে মিলে যেত, এবং সেই স্বীকারোক্তিই পরবর্তীতে সংবাদপত্রে “প্রমাণ” হিসেবে প্রকাশিত হতো। এটা এক ধরনের আত্মপূরণকারী চক্র, যেখানে মিথ্যা প্রচারণাই নিজের প্রমাণ তৈরি করে নিচ্ছিল।

৬.৩ দুই-পর্যায়ের হত্যা মডেল

এই জিজ্ঞাসাবাদ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড সারা দেশে বিক্ষিপ্তভাবে ঘটেনি, বরং তা একই দুই-পর্যায়ের কাঠামো অনুসরণ করেছিল। প্রথম পর্যায়ে ছিল প্রকাশ্য গণআটক, জনতার ভয়ভীতি প্রদর্শন, অফিস-ঘরবাড়ি জ্বালানো ও মব আক্রমণের মাধ্যমে মানুষকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হতো। দ্বিতীয় পর্যায়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। গোপনে রাতের আঁধারে বন্দিদের ব্যাচে ব্যাচে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা ও গণকবর দেওয়া হতো, এবং পরিবারকে কখনও জানানো হতো না। এই দ্বিতীয় পর্যায়টিই ছিল সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী, অথচ সবচেয়ে কম দৃশ্যমান। যে কারণে আজও এই গণহত্যার প্রকৃত পরিধি অনেকাংশে অস্পষ্ট ও অপ্রমাণিত হিসেবে থেকে গেছে।

৬.৪ কাপাল গণহত্যা: নৃশংসতার একটি বিস্তারিত দৃষ্টান্ত

এই দুই-পর্যায়ের কাঠামো বাস্তবে কেমন দেখাত, তার একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ পাওয়া যায় বালির কাপাল গ্রামে ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বরে সংঘটিত একটি গণহত্যায়। যার বিস্তারিত পুনর্গঠন সবচেয়ে নৃশংস অংশ। সেখানে আরপিকেএডি সেনারা একটি পূর্বনির্ধারিত স্থানে বন্দিদের লাইনে দাঁড় করিয়ে মেশিনগান দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এটি কোনো বিক্ষিপ্ত সহিংসতা ছিল না, বরং পূর্ব-পরিকল্পিত একটি নৃশংসতার নাট্যমঞ্চ বা “থিয়েটার অব অ্যাট্রোসিটি”। সেনাবাহিনী আগে থেকেই স্থানীয় বেসামরিক নেতাদের যেমন বুপাতি বা জেলা প্রধান, এবং তামেং মিলিশিয়া নেতাদের একটি “গেস্ট লিস্ট” তৈরি করে আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে এই হত্যাকাণ্ড দেখতে ডেকেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পিকেআই-সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী পুগেরকে আলাদাভাবে তরবারি দিয়ে অঙ্গচ্ছেদ করে হত্যা করা হয়। তার বাহু কেটে নেওয়া হয় এবং তাকে গণকবরের সবচেয়ে নিচে স্থান দেওয়া হয়, যা প্রতীকীভাবে তার “সবচেয়ে বড় অপরাধী” পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার একটি প্রয়াস ছিল। স্থানীয় তামেং নেতা স্বেচ্ছাসেবক খুঁজতে গেলে যখন কেউ এগিয়ে আসেনি, তখন তিনি তাদের “নারীসুলভ ভীতু” (banci) বলে অপমান করেন, যাতে দুজন তরুণ লজ্জায় এগিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এটি দেখায় কীভাবে সামাজিক চাপ ও পুরুষত্ব প্রমাণের ভয়ও সাধারণ মানুষকে হত্যায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেছিল। জেমব্রানা অঞ্চলে আরেকটি ঘটনায় তিনজন সেনা-মিলিশিয়া সদস্যের মৃত্যুর প্রতিশোধে রাস্তায় একটি অনুপাত প্রচলিত হয়েছিল: “এক সৈনিকের জীবনের মূল্য এক হাজার পিকেআই জীবন।”

৬.৫ আঞ্চলিক বৈচিত্র্য

তবে এই নৃশংসতার তীব্রতা সারা দেশে একরকম ছিল না, যা আবারও প্রমাণ করে যে এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ নয়। বরং স্থানীয় কমান্ডারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। আচেহ ও উত্তর সুমাত্রার আঞ্চলিক কমান্ডাররা শুরু থেকেই হত্যার নীতি অনুসরণ করেন, পূর্ব জাভায় তা কিছুটা বিলম্বিত হয়, আর পশ্চিম জাভার কমান্ডার ইব্রাহিম আজি ও পশ্চিম সুমাত্রা-রিয়াউয়ের কমান্ডার পানুজু সুকার্নোর নির্দেশ মেনে গণহত্যা রোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও কেন্দ্রীয় সেনা হাইকমান্ড পরবর্তীতে বালিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠিয়ে স্থানীয় প্রতিরোধ ভেঙে দেয়। এই বৈচিত্র্য স্পষ্ট করে দেয় যে গণহত্যা থামানো সম্ভব ছিল, যদি সংশ্লিষ্ট কমান্ডার তা চাইতেন। যা প্রমাণ করে দায় ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের, কোনো অনিবার্য সামাজিক প্রক্রিয়ার নয়।

৭। মূল কুশীলবরা

এতদূর আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে এই গণহত্যা কোনো একক ব্যক্তি বা একটিমাত্র সিদ্ধান্তের ফল ছিল না, বরং একাধিক স্তরের কুশীলবের সমন্বিত কর্মকাণ্ডের ফল। নিচের সারণিতে এই কুশীলবদের সংক্ষিপ্তভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হলো:

জাকার্তা মেথডের মূল কুশীলবরা
এই সারণির শেষ সারিটি—আন্তর্জাতিক সমর্থক—বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই গণহত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন জাতীয় ঘটনা ছিল না; এর পেছনে ছিল তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের বিশ্বব্যাপী রাজনীতি, যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখব।

৮। সমর্থন ও অর্থায়ন: সিআইএ এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকা

ইন্দোনেশিয়ার এই অভ্যন্তরীণ ঘটনা তখনকার বৃহত্তর স্নায়ুযুদ্ধ ভূরাজনীতির বাইরে ঘটেনি। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টির পতন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছিল এক বিশাল ভূরাজনৈতিক স্বস্তি, এবং তাই ওয়াশিংটন শুরু থেকেই এই ঘটনাবলিতে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল।

৮.১ মার্শাল গ্রিন ও সিআইএ স্টেশন চিফ টোভার: ঘটনার প্রথম দিনগুলো

ছয় জেনারেল নিহত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শাল গ্রিন ওয়াশিংটনে রিপোর্ট করেন যে ইন্দোনেশিয়ায় কার্যত দুটি সরকার চলছে - একটি সুকার্নোর, অন্যটি সেনা নেতৃত্বের - এবং সুকার্নো স্পষ্টভাবে সেনা অভিযান অনুমোদন না করলেও তা থামানোর ক্ষমতা তাঁর নেই। তাঁর সিআইএ স্টেশন চিফ বি. হিউ টোভার প্রথম দিকে উদ্বিগ্ন ছিলেন যে জেনারেলরা সুকার্নোর কাছে নতি স্বীকার করে সংকটের সুযোগ পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগাবেন না, কিন্তু সুহার্তোর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সময় থেকেই তাঁরা আশ্বস্ত হন যে সুহার্তো দৃঢ়ভাবে পিকেআই ধ্বংসের অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

৮.২ একটি ভুল মার্কিন পূর্বাভাস

আগের অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে সেনাবাহিনী নিজেই বছরের পর বছর ধরে এই অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এই প্রস্তুতির গভীরতা সঠিকভাবে আঁচ করতে পারেনি। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে—অর্থাৎ ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে—সিআইএ, এনএসএ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের যৌথ মূল্যায়ন ছিল যে সুকার্নোর মৃত্যু হলেও সেনাবাহিনী কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি নিতে “সম্ভবত অনিচ্ছুক” হবে। এই পূর্বাভাস সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়—যদিও পরবর্তীতে মার্কিন সরকার এই অভিযানের পূর্ণ সমর্থক ও সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে।

৮.৩ সিআইএ-র গর্ব ও ভবিষ্যৎ “মডেল” হিসেবে সুপারিশ

ভুল পূর্বাভাস সত্ত্বেও, ঘটনার পরবর্তী পরিণতি দেখে সিআইএ-র মনোভাব দ্রুত বদলে যায়। রুসা তাঁর ভূমিকায় স্পষ্টভাবে লেখেন যে সিআইএ এই গণহত্যাকে নিয়ে “গভীরভাবে গর্বিত” (extremely proud) ছিল এবং একে ভবিষ্যতের অনুরূপ অভিযানের জন্য একটি মডেল হিসেবে সুপারিশ করেছিল। এই “মডেল” ধারণাটি স্রেফ তাত্ত্বিক থাকেনি। চিলিতে জেনারেল পিনোশের ১৯৭৩ সালের অভ্যুত্থান এবং আর্জেন্টিনার সামরিক জুন্তা -দুটোই বামপন্থীদের গুম করার কৌশলে ইন্দোনেশিয়ার এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছিল। পিনোশের অভ্যুত্থানের আগে চিলির বামপন্থীদের দরজায় সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হতো - “জাকার্তা আসছে” (Djakarta se acerca) - যা দেখায় ইন্দোনেশিয়ার এই গণহত্যা কীভাবে গোটা লাতিন আমেরিকায় একটি ভীতিকর প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।

৮.৪ সিআইএ-র নিজস্ব প্রতিবেদন: হেলেন-লুইস হান্টার ও জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিলিপি

সিআইএ-র এই সমর্থন নিষ্ক্রিয় ছিল না। সংস্থাটি ইন্দোনেশীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পিকেআই-র মামলা শক্তিশালী করতে সরাসরি সহায়তাও করে। ভার্জিনিয়ার লাংলিতে সিআইএ তার এজেন্ট হেলেন-লুইস হান্টারকে দায়িত্ব দেয় সেপ্টেম্বর ৩০ আন্দোলনের ওপর একটি বিশ্লেষণ লিখতে। যদিও তিনি ইন্দোনেশীয় ভাষা জানতেন না; তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছিল সামরিক অভ্যুত্থান বিশ্লেষণে সাধারণ দক্ষতার কারণে। ইন্দোনেশীয় সেনা কর্মকর্তারা (সম্ভবত নোতোসুসান্তো ও সালেহ) বিপুল সংখ্যক জিজ্ঞাসাবাদ-প্রতিলিপি সিআইএ-কে সরবরাহ করেন, যা ইংরেজিতে অনুবাদ করে হান্টারের হাতে দেওয়া হয়। সিআইএ ১৯৬৮ সালে তাঁর বিশ্লেষণ “Indonesia—1965: The Coup That Backfired” শিরোনামে প্রকাশ করে - লেখকের নাম উহ্য রেখে। এই “প্রমাণ” আসলে নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যার অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতিও ছিল প্রচুর। অর্থাৎ আমরা ষষ্ঠ অধ্যায়ে যে নির্যাতন-নির্ভর “সত্য তৈরি”র প্রক্রিয়া দেখেছি, তা সরাসরি গিয়ে পৌঁছেছিল সিআইএ-র সরকারি প্রতিবেদনেও।

৮.৫ অর্থনৈতিক মাত্রা: ফোর্ড ফাউন্ডেশন, “বার্কলি মাফিয়া” ও ক্যালটেক্স

এই আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার একটি অর্থনৈতিক দিকও ছিল। ফোর্ড ফাউন্ডেশন একই সময়ে জাকার্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ গড়ে তুলতে অর্থায়ন করছিল, যেখানে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলি প্রশিক্ষিত অর্থনীতিবিদরা (পরবর্তীতে “বার্কলি মাফিয়া” নামে পরিচিত) সুহার্তোর প্রধান অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারক হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে মার্কিন বহুজাতিক তেল কোম্পানি ক্যালটেক্স দীর্ঘদিন ধরেই “সিআইএ এর সম্প্রসারণ” বলে সন্দেহভাজন ছিল - বিশেষত ১৯৫৭-৫৮ সালের সিআইএ-সমর্থিত পিআরআরআই/পেরমেস্তা বিদ্রোহে মার্কিন সরকারের সমর্থনের প্রেক্ষাপটে। গণহত্যার পর সুমাত্রার তেল ও বাগান শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, যা একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বহুজাতিক ব্যবসায়িক স্বার্থকেও উপকৃত করে। এভাবে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল বছরের পর বছরের নীরবতা ও দায়মুক্তি - যা নিয়েই আমাদের পরবর্তী আলোচনা।

৯। পরিণতি, ধামাচাপা ও স্বাভাবিকীকরণ

গণহত্যা থেমে যাওয়ার পরও এর গল্প শেষ হয়নি। বরং পরবর্তী ছয় দশক জুড়ে রাষ্ট্র এই ইতিহাসকে কীভাবে গোপন রেখেছে, অস্বীকার করেছে এবং স্বাভাবিক করে তুলেছে - তার একটি দীর্ঘ ও জটিল কাহিনি রয়েছে।

৯.১ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন: তদন্তের নামে ধামাচাপা

ধামাচাপার প্রথম প্রচেষ্টা শুরু হয় ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই, যখন সুকার্নো নিজে ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে একটি “ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন” গঠন করেন। কিন্তু সেনা হাইকমান্ড এই কমিশনের কার্যক্রম ভেতর থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে। কমিশনের সদস্যদের কেবল সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হতো, এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডকে “ক্ষিপ্ত জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া” বলে চিত্রিত করা হয়। যদিও প্রতিবেদনের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় সংস্থার গোপন, অস্বীকৃত মৃত্যুদণ্ডের উল্লেখ ছিল। সুকার্নো নিজেই শেষ পর্যন্ত প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে অস্বীকার করেন। যা এক ধরনের পরিহাসের বিষয় যে যাঁকে এই হত্যাকাণ্ড ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তিনিই শেষমেশ প্রথম ধামাচাপার অংশীদার হয়ে যান।

৯.২ বত্রিশ বছরের রাষ্ট্রীয় নীরবতা

সুকার্নোর এই প্রাথমিক ধামাচাপা পরবর্তীতে এক বহুদশক-ব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতায় রূপ নেয়। সুহার্তোর শাসনামলে (১৯৬৬-১৯৯৮) রাষ্ট্র কখনও হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি, কিন্তু কখনও তার বিস্তারিত বিবরণও দেয়নি - নিছক এড়িয়ে গেছে। সরকারি পাঠ্যবই ও জাতীয় ইতিহাসগ্রন্থে (যার সম্পাদক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুগ্রহো নোতোসুসান্তো) হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি একটি মাত্র অস্পষ্ট বাক্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। আজও ইন্দোনেশীয় স্কুল-পাঠ্যবইয়ে এই গণহত্যার বিস্তারিত কিছু শেখানো হয় না; শুধু শেখানো হয় যে পিকেআই একটি “মন্দ সংগঠন” ছিল। অর্থাৎ যে প্রোপাগান্ডার বয়ান ১৯৬৫ সালে তৈরি হয়েছিল, তা প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে।

৯.৩ দায় হস্তান্তর: সেনা বনাম বেসামরিক মিলিশিয়া

এই নীরবতার পাশাপাশি আরেকটি কৌশলও গড়ে ওঠে। দায় এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষে সরিয়ে দেওয়া। পরবর্তী দশকগুলোতে সেনাবাহিনী দায় বেসামরিক জনতার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার রীতি গ্রহণ করে, আর বেসামরিক মিলিশিয়ারা দাবি করে যে তারা কেবল সেনা নির্দেশ অনুসরণ করেছিল। আমরা আগেই দেখেছি যে ১৯৯৬ সালে এনইউ-র “বানসের বেরজিহাদ” গ্রন্থ এই দাবি প্রমাণ করতে গিয়ে অজান্তেই রাষ্ট্রের গোপন অপরাধই প্রকাশ করে ফেলেছিল যেটা একটি বিরল ব্যতিক্রম, যেখানে দায় এড়ানোর চেষ্টাই উল্টো সত্য প্রকাশে সহায়ক হয়েছিল।

৯.৪ “দ্য অ্যাক্ট অব কিলিং” ও স্মৃতির জটিলতা

এই দীর্ঘ নীরবতার মধ্যেই ২০১২ সালে একটি তথ্যচিত্র আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জোশুয়া অপেনহাইমারের “দ্য অ্যাক্ট অব কিলিং”-এ মেদানের সাবেক মৃত্যুদণ্ড-কার্যকরকারী আনোয়ার কোংগো প্রকাশ্যে তাঁর নৃশংসতার পুনরাভিনয় করেন। এটি ইন্দোনেশীয় সমাজের সাধারণ মনোভাবের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং আনোয়ারের এই আচরণ তাঁর নিজের ক্ষতবিক্ষত স্মৃতির সঙ্গে মোকাবিলার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ছবিতেই দেখা যায় তাঁর সহযোগীরা তাঁকে সতর্ক করছেন - এই কাহিনি প্রকাশ পেলে তারা পিকেআই এর চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর বলে বিবেচিত হবেন, যা দেখায় যে দশকের পর দশক পার হলেও অপরাধীদের মধ্যেও এক প্রকার সামাজিক লজ্জার ভয় এখনও বিদ্যমান।

১০। উপসংহার

শুরুতে আমরা দেখেছিলাম কীভাবে সুকার্নোর গাইডেড ডেমোক্রেসিতে পিকেআই ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এক অস্থির ভারসাম্য বজায় ছিল। জন রুসার “Buried Histories” গ্রন্থটি এই পুরো যাত্রাপথ অনুসরণ করে দেখিয়েছে যে কীভাবে সেই ভারসাম্য একটি দীর্ঘ, পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভেঙে পড়ে—কোনো আকস্মিক জনরোষে নয়। এর শিকড় ছিল ১৯৫০-এর দশক থেকেই সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক মৌলবাদীকরণে, মার্কিন-সহায়তায় গড়ে ওঠা টেরিটোরিয়াল কমান্ড ও SESKOAD থিংক ট্যাংকে। সেপ্টেম্বর ৩০-এর ক্ষুদ্র, ব্যর্থ ও বিক্ষিপ্ত আন্দোলনকে অজুহাত করে এই পূর্ব-প্রস্তুত যন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে, এবং যৌথ অপরাধ আরোপ, অমানবিকীকরণ, কাল্পনিক হুমকি ও ইতিহাস বিকৃতি—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে, ধর্মীয় উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে নৃশংসতায় সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় সহযোগীতে রূপান্তরিত করে।
সিআইএ ও মার্কিন সরকার শুরুতে দ্বিধান্বিত থাকলেও শেষ পর্যন্ত এই অভিযানের পূর্ণ সমর্থক হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে এটিকে বিশ্বব্যাপী কমিউনিজম-বিরোধী দমন-অভিযানের “মডেল” হিসেবে প্রচার করে—যার প্রভাব পরবর্তীতে চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দূরবর্তী দেশেও পৌঁছেছিল। আর সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ছয় দশক পার হলেও, এবং নাম-মাত্র “নিষ্পত্তি” প্রচেষ্টার পরও, এই গণহত্যার দায়স্বীকার ও প্রকৃত ন্যায়বিচার আজও অধরা রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, সামরিক প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ—এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি কাঠামো আজও এই ইতিহাসকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে। জন রুসার গ্রন্থের মূল শিক্ষা তাই কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় জানা নয়—বরং বোঝা যে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি, প্রোপাগান্ডা ও সামাজিক-ধর্মীয় উদ্বুদ্ধকরণের সমন্বয়ে সাধারণ মানুষও নৃশংসতার অংশীদার হয়ে উঠতে পারে—এবং কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেই ইতিহাসকে কয়েক দশক ধরে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারে।

১১। বইটির পরিচিতি ও পদ্ধতি

এই জটিল ও বহুস্তরীয় ইতিহাসকেই কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ জন রুসা তাঁর “Buried Histories” গ্রন্থে নতুনভাবে পুনর্গঠন করেছেন। তিনি মাঠপর্যায়ের মুখে-মুখে সংগৃহীত ইতিহাস (oral history)—অর্থাৎ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া মানুষদের সাক্ষাৎকার এবং সূক্ষ্ম গবেষণা একত্র করে দেখিয়েছেন যে এই নিধনযজ্ঞ সামরিক একনায়কত্বের শীর্ষ থেকে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে পরিচালিত একটি অভিযান ছিল, নিছক বিক্ষিপ্ত জনরোষ নয়। তিনি সুরাকার্তা (মধ্য জাভা), বালি ও সুমাত্রার নির্দিষ্ট স্থানীয় ঘটনা ধরে বিশ্লেষণ করে দেখান কীভাবে প্রোপাগান্ডা, ধর্মীয় উদ্বুদ্ধকরণ, নির্যাতন ও সংগঠিত হত্যা একে অপরের সঙ্গে জড়িত ছিল।

তিনি আরও দুজন প্রভাবশালী ইতিহাসবিদ—জেস মেলভিন (আচেহ প্রদেশ নিয়ে গবেষণা) ও জিওফ্রি রবিনসন (জাতীয় পর্যায় নিয়ে গবেষণা)—এর কাজের সঙ্গে সংলাপ করে দেখান যে “স্থানীয় দ্বন্দ্ব” তত্ত্ব, যা মূলত সুহার্তোর নিজস্ব সরকারি বয়ান থেকে উদ্ভূত এবং যা দাবি করে যে হত্যাকাণ্ড গ্রামীণ পুরনো শত্রুতা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নিয়েছিল, তা মূলত ভুল একটি ব্যাখ্যা। দায় মূলত সেনাবাহিনীর হাইকমান্ডের, যারা একে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্দেশনা দিয়ে পরিচালনা করেছিল। এই উপসংহার বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে দেখতে হবে, ১৯৬৫ সালের অক্টোবরের আগেই সেনাবাহিনী কীভাবে আদর্শগতভাবে পিকেআই-বিরোধী একটি যুদ্ধপ্রস্তুত শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।

তথ্যসূত্র:

Roosa, J. (2020). Buried Histories: The Anticommunist Massacres of 1965–1966 in Indonesia. University of Wisconsin Press.
Roosa, J. (2006). Pretext for Mass Murder: The September 30th Movement and Suharto’s Coup d’État in Indonesia. University of Wisconsin Press.
Anderson, B. & McVey, R. (1971). A Preliminary Analysis of the October 1, 1965, Coup in Indonesia. Cornell Modern Indonesia Project.
Robinson, G. (2018). The Killing Season: A History of the Indonesian Massacres, 1965–66. Princeton University Press.
Melvin, J. (2018). The Army and the Indonesian Genocide: Mechanics of Mass Murder. Routledge.
Sunyoto, A. et al. (1996). Banser Berjihad: Menumpas PKI. Pesulukan Thoriqoh Agung.
Simpson, B. (2008). Economists with Guns: Authoritarian Development and US–Indonesian Relations, 1960–1968. Stanford University Press.

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি জন রুসার উল্লিখিত গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত একটি বিস্তারিত, প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাসহ বিশ্লেষণাত্মক সারসংক্ষেপ। সম্পূর্ণ বিস্তারিত তথ্য, পাদটীকা ও সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃতির জন্য মূল গ্রন্থটি পাঠ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

JadeWits Technologies Limited
সর্বশেষপঠিতনির্বাচিত

আমরা আমাদের সেবা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করি। আমাদের কুকি নীতির শর্তাবলী জানার জন্য অনুগ্রহ করে এখানে ক্লিক করুন। কুকি ব্যবহারের জন্য আপনি সম্মত হলে, 'সম্মতি দিন' বাটনে ক্লিক করুন।