২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নাম জুলাই আন্দোলন হল কেন? কে ঠিক করেছে এই নাম? ৩৬ জুলাই ধারণা কোথা থেকে আসল? বাংলাদেশে কোনো আন্দোলনের নাম দিন-তারিখ দিয়ে হয় না। ঘটনা ঘটার পর নানা বিশ্লেষণে দিন-তারিখের নাম যুক্ত হয়।
ইন্দোনেশিয়ায় জাকার্তা মেথড শুরুর জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল, তার নাম ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর আন্দোলন। যার উদ্দেশ্য ছিল একটি রাজনৈতিক ধারা ও তার পেছনের দলকে নিশ্চিহ্ন করা। এটা করতে তারা অন্তত ১০ লক্ষ ইন্দোনেশীয় বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদীকে হত্যা করে।
"ইন্দোনেশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি (পিকেআই) ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে কার্যকরভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, মাত্র পাঁচ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে। এর নেতৃবৃন্দ এবং অনেক সাধারণ সদস্য ও সমর্থককে হত্যা করা হয়, কারাগারে বন্দি করা হয় অথবা গুম করা হয়।
এই ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীদের কার্যকলাপের মাধ্যমে, যারা নিজেদেরকে “৩০শে সেপ্টেম্বর আন্দোলন” নামে একটি গোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দেয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন চাক্রাবিরাওয়া প্রাসাদ রক্ষী বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল উন্তুং।
চাক্রাবিরাওয়া সামরিক বাহিনীর সকল শাখার সদস্যদের নিয়ে গঠিত ছিল এবং এর দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপতিকে সুরক্ষা দেওয়া। আন্দোলনটি নিজেকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে দেখত — সিনিয়র সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিকল্পিত ডানপন্থী অভ্যুত্থান ঠেকাতে তারা আগাম ব্যবস্থা নিয়েছিল বলে মনে করত।" [দি আর্মি অ্যান্ড দি ইন্দোনেশিয়ান ম্যাস মার্ডার, *মেকানিকস অব ম্যাস মার্ডার*, জেস মেলভিনের বই থেকে]।
ইন্দোনেশিয়ার সেই ৩০শে সেপ্টেম্বর আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল তাদের টার্গেট গ্রুপ পিকেআই এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী ও চীনা বংশোদ্ভূতদের পরিবার, বন্ধু এবং সমর্থকসহ বিনাশ করা। এই টার্গেট গ্রুপকে লক্ষ্য করে দীর্ঘদিন তারা বিশেষ ঘৃণাবাচক শব্দ ব্যবহার করে সামাজিক-মনোজাগতিক অবদমন বা নিকৃষ্টতা আরোপের জন্য।
এই বিস্তৃত লক্ষ্য গোষ্ঠীকে সম্মিলিতভাবে “কমিউনিস্ট গোষ্ঠী” (কাউম কমিউনিস), “প্রতিবিপ্লবী”, “অবিশ্বাসী” (কাফির, তিদাক বেরাগামা) এবং “নাস্তিক” (আথেইস, অ্যান্টি-তুহান) হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছিল।
এই সম্মিলিত লেবেলগুলোর উদ্দেশ্য ছিল এই ধারণা প্রচার করা যে, এই লক্ষ্যবস্তু গোষ্ঠীটি অভ্যন্তরীণভাবে সংহত এবং তাদের মধ্যে একটি সাধারণ বিশ্বাসব্যবস্থা ও আত্মপরিচয় রয়েছে।
এ ছাড়া এই গোষ্ঠীর সদস্যদের প্রায়ই সম্মিলিতভাবে “বিশ্বাসঘাতক” (পেংখিয়ানাত), “অমানবিক” (বেয়াদাব), “শয়তান” (ইবলিস), “কুকুর” (আসু) এবং নারীদের ক্ষেত্রে “বেশ্যা” (পেলাচুর) হিসেবে বর্ণনা করা হতো।
৩০শে সেপ্টেম্বর আন্দোলনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিদের প্রকৃত সংযোগ — যা ছিল সামরিক বাহিনীর এই গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার আনুষ্ঠানিক যৌক্তিকতা — সামরিক আক্রমণ শুরু হওয়ার পর আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
বরং যাদের এই ব্যক্তি বলে অভিযোগ করা হয়েছে, সেই পরিচয়ের ভিত্তিতেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই যুক্তি অনুসারে, প্রতিটি লেবেল একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল: “পিকেআই” মানে “কমিউনিস্ট” মানে “বিশ্বাসঘাতক”; “পিকেআই” মানে “প্রতিবিপ্লবী” মানে “অমানবিক”; “পিকেআই” মানে “কাফির” মানে “শয়তান”; “পিকেআই” মানে “নাস্তিক” মানে “কুকুর” — এবং এর উল্টোটাও সত্য।
এর ফলে পিকেআই ক্যাডারের পরিবারের সদস্য, “সহযোগী সংগঠন”-এর সদস্য, বা এমন কোনো ব্যক্তির বন্ধু বা সহযোগীও “পিকেআই” লেবেলে চিহ্নিত হয়ে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারতেন। এমনকি যাদের পিকেআই বা তার সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই ছিল না, কিন্তু যাদের গ্রামে পিকেআই-এর গ্রামপ্রধান ছিলেন, অথবা ইন্দোনেশিয়ার জাতিগত চীনা সম্প্রদায়ের সদস্য, যারা পিকেআই-এর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বা না ছিলেন — তাঁরাও এই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতেন।
এভাবে অভিযোগ বা সংশ্রবের ভিত্তিতে চিহ্নিত এই ব্যক্তিদের, একবার “পিকেআই” বলে চিহ্নিত হওয়ার পর, এই অভিধা চ্যালেঞ্জ করার কোনো আনুষ্ঠানিক উপায় ছিল না। [দি আর্মি অ্যান্ড দি ইন্দোনেশিয়ান ম্যাস মার্ডার, *মেকানিকস অব ম্যাস মার্ডার*, জেস মেলভিনের বই থেকে]।
এবার বাংলাদেশে জামাত, বিএনপি, মোল্লা-মিলিটারি গং যে ভাষায় কথা বলে, যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে তারা সম্বোধন করে, ট্যাগ লাগায়, লেবেলিং করে, সেটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।
রোম সংবিধি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এই ধরনের ঘৃণাবোধক সম্বোধন, ট্যাগ লাগানো বা লেবেলিং মানবতাবিরোধী অপরাধ। কারণ এটি গৃহযুদ্ধ প্ররোচিত করা বলে প্রমাণিত।
উপরের এই বর্ণনা মার্কিন ছকে সিআইএ-পরিকল্পিত ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা মেথড গণহত্যার বিবরণ। বাংলাদেশে ২০০৯-এর বিডিআর বিদ্রোহ এবং ২০২৪-এর কোটা আন্দোলনকে ভর করে একটি গণহত্যার পরিকল্পনা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিছু না বুঝেই সেটাতে যোগ দিয়েছিল এ দেশের তরুণ সমাজ। যার বেনিফিশিয়ারি হলো জামাত, বিএনপি, মোল্লা-মিলিটারি গং।
সেই ২০০৯ সালেই শেখ হাসিনা বলেছিলেন, "বিডিআর সদর দপ্তরে বহু মেধাবী সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে রক্তাক্ত ঘটনা ঘটানো ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য ছিল নৈরাজ্য সৃষ্টি করা এবং দেশকে গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেওয়া... তারা (বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনাকারীরা) এখনও একটি গৃহযুদ্ধ শুরু করতে চায়।" [‘বিডিআর বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনাকারীরা গৃহযুদ্ধ শুরু করতে চেয়েছিল,’ জি নিউজ, (৮ মার্চ ২০০৯)]।
কভারের ছবি: শিল্পকর্ম মোকানিক্স অব ম্যাস মার্ডার, © অলিত আমবারা।
© সিরাজুল হোসেন
