গুলশানের আমারিতে একটা দিনব্যাপি ওয়ার্কশপে গেছি এমন সময় একটি অচেনা নাম্বার থেকে ফোন। রিসিভ না করে মেসেজ করলাম। পরিচিত এক জুনিয়র ছেলে বেশ কয়েক বছর ধরে ইউরোপে থাকে, সে একজন নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার। দেশেরই একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে গেছে। দেশে এসেছে, আমার সাথে দেখা করতে চায়। আমি জানালাম চারটায় আমার ওয়ার্কশপ শেষ হবে, পাঁচটার দিকে এখানেই একটা ক্যাফে আছে ক্যাসকেড, সেখানে আসতে।
সেই ওয়ার্কশপেই দেখা হয়ে গেল এক প্রাক্তন সহকর্মির সাথে যে ঠিক আমার প্রতিষ্ঠানে ছিল না, ছিল একটি সিস্টার অর্গ্যানাইজেশনে। লাঞ্চের সময় আমরা এক টেবিলে বসলাম, মেয়েটা বলল সে আমার সাথে একটু প্রাইভেটলি কথা বলতে চায়। আমি বললাম এটা শেষ করে আমরা কথা বলতে পারি।
ওয়ার্কশপ শেষ হয়ে গেল সময় মত। আমি মেয়েটাকে খুঁজে নিয়ে বললাম চল ক্যাফেতে বসি। ক্যাফেতে গিয়ে আমরা মুখোমুখি বসলাম। অসম্ভব সুন্দরী মেয়েটার বয়স খুব বেশী নয় কিন্তু তার মধ্যে একটা ব্যক্তিত্ব বিদ্যমান যেটা এখন খুব দুর্লভ। বেশ সেজেগুজে এসেছে কিন্তু এমন ভাবে যে তাকে আতিশয্য বলা যাবে না।
লাইম গ্রিন জামদানী শাড়ি, সোনালী কাজ করা পাড়, লাইম ইয়োলো ব্লাউজ। টকটকে ফর্সা ওর শরীরের সাথে যেন রংগুলো মিশে গেছে। পুরো মানুষটাকেই মনে হচ্ছে যেন একটা অসাধারণ শিল্পকর্ম। মুখের সাজে আতিশয্য কিছু নেই। লিপস্টিক দিয়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না, ওর দেবার প্রয়োজনও নেই। কানে ছোট্ট দুটো ওপালের দুল। কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ এবং সিঁথির মাঝে ছোট্ট একটি সিঁদুরের লম্বাটে দাগ।
সিনোমায় বা টেলিভিশনের সোপ অপেরায় এই ধরনের মেয়েদেরই নায়িকা হিসাবে দেখা যায়। এবং পুরুষ দর্শকেরা সাবাই তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকে। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমি ওর দিকে তাকালে দেখি অন্তহিন সমস্যায় ডুবন্ত একটা মানুষ প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে বেঁচে থাকার। বিয়েটা ওর জীবনে একটা ভুল সিদ্ধান্ত যেটা ওর এবং ওর শ্বশুরবাড়ী, দুটো ডিসফাংশনাল পরিবরারের মধ্যে সংযোগ। যেটা অনেকটা দুটো ডুবন্ত জাহাজকে আষ্টেপিষ্টে বাধার মত। মেয়েটা সেই দুটো ডুবন্ত জাহাজকে একসাথে বেঁধে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে যেখানে সে নিজেই সাঁতার জানে না, তাই হাবুডুবু খাচ্ছে। ওকে বাঁচতে হলে এই দুই পরিবার থেকেই ওদের দুরত্ব তৈরী করতে হবে কিন্তু এই দুটি পরিবারের কাছে নিজেকে প্রমাণ করাই যেন ও লক্ষ্য।
আমার কাছে পরামর্শ চাইল তার ভাইকে নিয়ে পরিবারে কিছু সমস্যা হচ্ছে সেটা নিয়ে। আমি যতটুকু বুঝলাম সেই অনুযায়ী পরামর্শ দিলাম। কিন্তু আসলে যেটা করতে হবে, তাকে বাস্তবতা বুঝতে হবে, কিন্তু মেয়েটা যেন তার নিজ মনের সেই আদর্শ জগতে আবদ্ধ। যেখানে সে নিজেই সবকিছুর সমাধান করতে চায় কিন্তু সে নিজের পরিস্থিতি, ক্ষমতা ও বাস্তবতার দিকে সে তাকাতে নারাজ।
মেয়েটার সাথে কথা শেষ হতে না হতেই সেই পরিচিত জুনিয়র ছেলেটি এসে হাজির। কাছাকাছি আসতেই আমি তাকে হাতের ইশারায় ডাকলাম। কাছে এসে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছেলেটির যেন মুখের কথা হারিয়ে ফেলল, মুখে রক্তিম আভা দেখা দিল। আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম পরস্পরকে। মেয়েটি বলল ভাইয়া আমি উঠি, পরে আপনাকে জানাব কি হয়, বলে সে বিদায় নিল।
ছেলেটা বলল মেয়েটা অসম্ভব সুন্দরী তো? কিন্তু হিন্দু! আমি বললাম বাংলাদেশে এখনও যত সুন্দরী মেয়ে আছে তার অর্ধেক কিন্তু হিন্দু যদিও মোট জনসংখ্যা শতকরা মাত্র বারো ভাগ তারা। আমরা তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছি নানা ভাবে চাপ দিয়ে। ছেলেটা বলল শুদ্ধ হবার জন্য নিয়মিত গোবর, গোমূত্র খায় তো তাই ওরা এত সুন্দর হয়। কথাটা আমার ভাল লাগল না। জবাব না দিয়ে আমি বললাম কি নিবা? আমি আর একটা শর্ট এসপ্রেসো নোবো। ছেলেটা বলল সে এসপ্রেসো খায় না, তার ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্স আছে তাই সে দুধ দেওয়া কিছু খেতে পারে না, তাই কোন কফিই সে খায় না। সে লেমন টি নেবে।
ছেলেটার হাতে ছিল ইউভাল নোয়া হারারির স্যাপিয়েন্স বইটা। সেটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে সে বলল বইটা পড়েছি কি না? নিজেকে আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী ও সেক্যুলার ভাবা ছেলেটার প্রতি বিরক্ত হয়েই বললাম পড়েছি, কিন্তু আমি পছন্দ করি নাই। সে বলল কেন? আমি বললাম বিজ্ঞান এই বিশ্বকে দেখার জন্য একটি অসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী, সেটা দিয়ে জোর করে সবকিছু দেখলে সেটা বৈজ্ঞানিক মৌলবাদ। বিজ্ঞানের এলাকা শুধু ততটুকুই, যতটুকু প্রমাণ করা যায়, তার বাইরে বিজ্ঞানের কোন এখতিয়ার নেই, সেই চেষ্টা করাও ঠিক নয়।
আমি তাকে বললাম তোমার ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্স কবে থেকে? সে বলতে পারল না, বলল তার বুদ্ধি হওয়া থেকেই সে দেখছে সে দুধ হজম করতে পারে না। আমি বললাম এটা কেন হয় জান? বলল জেনেটিক সমস্যা। আমি বললাম একসময় এই দুনিয়ায় কোন মানুষই গরুর দুধের যে শর্করা বা ল্যাক্টোজ, সেটা হজম করতে পারত না। মানুষের ল্যাকটোজ পার্সিসটেন্স – মানে মানুষ পরিণত বয়সের হবার পরও ল্যাকটোজ হজম করার ক্ষমতা একটি নতুন ঘটনা, মাত্র হাজার পাঁচেক বছর ধরে মানুষ এটা করতে পারে, তার আগে পারত না।
ছেলেটি বলল হ্যাঁ পশু পালন শেখার পর এটা হয়েছে। আমি বললাম পশু পালন শেখার পর, এত অল্প সময়ে আমাদের জেনেটিক পরিবর্তন হল কিভাবে? ছেলেটি বলতে পারল না। আমি ছেলেটিকে বললাম তুমি সি-উইড খেয়েছ? সি-উইড একপ্রকার সাগরে জন্ম নেওয়া বহুকোষী অ্যলজি যেগুলো পানির নিচে হওয়া একপ্রকার শাকের মত। ছেলেটা বলল খায়নি। আমি বললাম খেলেও হজম করতে পারতে না। এটা শুধু জাপানিরা হজম করতে পারে। হাজার বছর ধরে এটা খাবার ফলে তাদের অন্ত্র এটা হজমের জন্য জেনেটিক পরিবর্তন করেছে।
ছেলেটি বলল এত কম সময়ে জেনেটিক পরিবর্তন হয় কিভাবে? আমি বললাম এটা ঠিক আমাদের দেহের জিনের পরিবর্তন নয়, এটা আমাদের অন্ত্রে বাস করা বিলিয়ন বিলিয়ন ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া, যাদের একসাথে বলা হয় মাইক্রোবায়োটা, তাদের জিনে পরিবর্তন। অথবা রেট্রো পরিবর্তন যেটা পরজীবি মারফত শরীরের কোষের জিনের পরিবর্তন করে থাকে। আমি তাকে বললাম হয়ত একসময় ক্ষুধা ও শিকারের অভাবে সাগরতীরে বাস করা জাপানীরা সি-উইড খাবার চেষ্টা করে কিন্তু হজম করতে পারে না। গবেষনায় দেখা গেছে প্রাণীর পাকস্থলিতে সি-উইডকে ভাঙ্গতে পারে যে এনজাইম সেটা সি-উইডেই থাকে এবং সেটা সংক্রমিত হয় সাগরের যে প্রাণীরা সি-উইড খায় তাদের মল বা মুখের লালা থেকে।
মানুষ যখন সেই এনজাইম প্রস্তুতকারী মাইক্রো অর্গ্যানিজম বা এনজাইম সহ সি-উইড খায়, তখন মানুষের পাকস্থলিতে বাস করা মাইক্রোবায়োটা সিউইডকে হজম করার সক্ষমতা অর্জন করে। অর্থাৎ নতুন কোন খাবার হজম করা শিখতে হলে সেই খারার যারা হজম করতে পারে সেই প্রাণীর মল খেতে হবে।
দশ হাজার বছর আগে মানুষ গরুর দুধ হজম করতে পারত না। কিন্তু গরুর বাছুর ঠিকই সেটা হজম করতে পারত। গরুর বাছুরের পাকস্থলী বা অন্ত্রে থাকা এনজাইম বা ব্যাক্টেরিয়া যদি মানুষের পেটে যায়, তাহলে সে শিখতে পারে কিভাবে ল্যাকটোজ ভাঙ্গতে হয়। তাই গুরুর দুধ খাবার চেষ্টা করলেই শুধু মানুষ গরুর দুধ হজম করার জেনেটিক পরিবর্তন করতে পারবে না। তাকে গরুর মল মুত্রও খেতে হবে।
এভাবেই মানুষ হজম করা শিখেছে নানা রকম খাবার যেটা তাদের মৌলিক খ্যাদ্য নয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল ও দ্রুত মিউটেটিং ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিক ট্রিকগুলো দ্রুত শেখে ও তারা সেটাকে জেনেটিক কোডে নিয়ে নেয়। আমাদের শরীরে থাকা মাইক্রোবায়োটা অথবা শরীরের কোষে সেই কোডের রেট্রো ট্রান্সফার আমাদের শরীরে সেই জেনেটিক পরিবর্তন ট্রান্সফার করে থাকে।
এই পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে নতুন চিকিৎসা শুরু হয়েছে ফিক্যাল মাইক্রোবায়োটা ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা এফএমটি। যার অর্থ হল হেলদি মানুষের মলের মাইক্রোবায়োটা নিয়ে দুর্বল বা অসুস্থদের খাওয়ানো। ছেলেটিকে বললাম তোমার পূর্বপুরুষেরা যদি গরুর মল মূত্র ভক্ষণ করত মাঝে মাঝে, তোমার এই ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স মনে হয় থাকত না। এখন মানুষের মল খেতে পার, এখন অনেক মানুষ তাদের মলের মাইক্রোবায়োটা বিক্রি করে। স্পেনে একটা মেয়ে আছে তারটা নাকি সবচেয়ে হেলদি, ঠিকানাটা দেব?