EN
আরও পড়ুন
রাজনীতি
মনে শুধু ঘৃণা আর আত্ম ঘৃণার প্রতিফলনে:
রাজনীতি
পলিটিক্যাল সিস্টেমস থিংকিং এর শিক্ষা
রাজনীতি
JadeWits Technologies Limited

“যার যেখানে ব্যথা, নেহাত সেখানে করে ডলামলা”

মাস হিস্টিরিয়া: রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আসমান কাঁপানো অযৌক্তিক আক্রোশ

দিনটা ছিল শনিবার। নতুন একটা লেন্স টেস্ট করার জন্য ভাবলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাই। বেশ সকাল, তখনও সাধারন ভ্রমণকারীরা আসেনি। টিকেট কাউন্টারের সামনেই গাড়িটা পার্ক করে ট্রাইপড, গিমবল হেড ইত্যাদি সেট করে তার উপর ক্যামেরা ও লেন্স লাগিয়ে কাঁধে নিয়ে টিকেট কেটে ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। লম্বা রাস্তাটার দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে জঘন্য সব নির্দেশ লেখা। যা আগে কখনও দেখিনি।
 
বোঝাই যায় সম্পূর্ণ অশিক্ষিত, রুচিবিহিন, হীনমন্য ব্যক্তিদের যৌন নীতি-পুলিশিং এর নানা হুমকি ধামকি লেখা যার শেষে লেখা “কতৃপক্ষ”। সাইনগুলো অনেকটা এরকম: “প্রধান শিক্ষকের লিখিত অনুমতি ছাড়া স্কুল ইউনিফর্ম পরে উদ্যানে আসা নিষেধ”, “ব্যবহারে বংশের পরিচয়”, “উদ্যানে খেলাধুলা নিষিদ্ধ”, “উদ্যানটি প্রেম কানন নয়”, আপত্তিকর অবস্থায় বসা নিষেধ”, শুধু তাই নয় দন্ডের চোখ রাঙ্গানিও আছে “অশ্লীল আপত্তিকর অবস্থায় বসা দন্ডনীয় অপরাধ”।

একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জাতীয় উদ্যানে ঢোকার মুখেই এই সারি সারি অশ্লীলতা মাখা সাইনবোর্ড যারা এগুলো লিখেছে তাদের মনের অশ্লীল কদর্যতা প্রকাশ করে। আমরা যারা বহু দিন ধরে বনে যাই বাংলাদেশের বনগুলো সম্পর্কে ও তাদের রক্ষক যারা তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে আমাদের চেয়ে বেশি কেউ মনে হয় জানে না। বন রেস্ট হাউজগুলো পেশাদার দেহব্যবসায়িদের দালাল কতৃক স্বল্প সময়ের জন্য ভাড়া দেওয়া হয় এটাই দেখেছি। 

কোন মেয়ে বন্ধু দেশি বা বিদেশি যাদের নিয়েই পার্কে গেছি, যেখানে রেস্ট হাউজ আছে সেখানে প্রায় সব সময়ই আমন্ত্রণ পেয়েছি কেয়ারটেকার বা তার সাথে সংযুক্ত প্রতিনিধি মারফত যে আমি সেটা ব্যবহার করতে পারি। আমি নিজে দেখেছি বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের কাউকে বিভাগীয় রেস্ট হাউজে সময় কাটিয়ে পেশাদার নারী দ্বারা শারীরিক আনন্দ উপভোগ করতে। এই গার্ডেনটিতে আর একটি সাইনে লিখা "উদ্যানটি শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র, উদ্যানের পবিত্রতা রক্ষা করুন" অথচ এটি ইজারা দেওয়া হয় ইটভাটা মালিকদের কাছে যেখানে তাদের লোকজন আবার দৈহিক আনন্দের জন্য দেহব্যবসায়িদের যায়গাও ভাড়া দেয়।

লালন বলেছেন “যার যেখানে ব্যথা, নেহাত সেখানে করে ডলামলা”, বেশি দুর যেতে হল না। সোজা রাস্তাটা শেষ হতেই একটা ঘেরা এলাকা শুরু, সেখানে গিয়ে একটা কাঠবিড়ালী পেয়ে সেটার ছবি তোলার চেষ্টা করছি তখন একটি মাঝবয়ষ্ক জুটি এল। তাদের দেখেই সেখানে ঘোরাফেরা করা সাদা লুঙ্গি পরা একটি লোক বলে উঠল "ঐ দিকে বইসেন না মামা, এই দিকে আসেন, ঐ যে ভিতরে চইল্যা যান, কেউ দেখব না।" আমাকে দেখিয়ে টিপ্পনি কাটল "এই মামার ক্যামেরা দেইখ্যা ডরাইয়েন না, আপনাগো ছবি তুলব না, মামার বড় ক্যামেরা, পাখি ধরব”।
 
আমার কাছাকাছি বয়সের ভাগিনার কথা শুনেই পরিষ্কার হয়ে গেল যে লাইন ধরে এত দন্ডের ভয় দেখানো সাইনগুলো কেন লাগানো হয়েছে। শিশু কিশোরদের যেন বলা হচ্ছে নিজেরা বন্ধু বা বান্ধবীর সাথে ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসবা না, দন্ড দেওয়া হবে, কিন্তু পেশাদার দেহজীবিদের নিয়ে আরও ভেতরে যাও, রাষ্টীয় সহযোগীতা করা হবে।

গেট দিয়ে ঢোকার সময়ই আমার সামনে ছিল একটি স্কুল ড্রেস পরা মেয়ে আর একটি ছেলে। মেয়েটার বয়স তের চৌদ্দ হবে, ছেলেটা হয়ত দু-এক বছর বেশী। রাস্তাটা বেশ লম্বা। তাদের পেছনে পেছনে ক্যামেরা ট্রাইপড ঘাড়ে হাঁটছি আমি। মেয়েটি শীর্ণকায়, মনে হচ্ছে দীর্ঘ অপুষ্টিতে ভোগা। আচরণে বেশ আবেগপ্রবণ, চটপটে, চেহারাটা মায়াময়। চাহনিতে ভীরুতা আর পলায়নউন্মুখ একটা চকিত ভাব। ছেলেটা একটু ধীরস্থির, চুপচাপ। মেয়েটা অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। ছেলেটা হুঁ-হাঁ করছে, কখনও মৃদু হাসছে। কথা প্রায় বলছেই না। 

মেয়েটার কথাগুলো ছিল দ্রুত এবং অনেকটা অবান্তর। এই যেমন মেয়েটা বলছিল গত সপ্তাহে সে তার এক কাজিনের বিয়ে খেতে গিয়েছিল। সেখানে তার এক বান্ধবীও তার সাথে ছিল। তার বান্ধবী বার বার হারিয়ে যাচ্ছিল। তারপর মেয়েটা প্রশ্ন করে কেন হারিয়ে যাচ্ছিল জান? তুমি তো বলতে পারবা না, তুমি তো বেকুব একটা। আস্ত গর্ধব। বলেই মেয়েটা হি হি করে হাসছিল। 

তারপর নিজেই উত্তর দিল ওর ইয়েও ওখানে ছিল, হি হি হি। পুরো প্রায় মিনিট দশেক তাদের পেছনে হাঁটার সময় মেয়েটার কথা শুনে আমারই যেন মাথা ধরে গেল অবান্তর বকবকানিতে। শুধু তাই নয়। প্রতিটি কথার শেষে ছেলেটাকে কথায় ছোট করার, হেয় করার একটা বিষয় ছিল যেটাতে মেয়েটা খুবই আনন্দ পাচ্ছিল। ছেলেটা এটা কেয়ারই করছিল না। ছেলেটা যেন মেয়েটার সাথে হেঁটেই আনন্দ পাচ্ছিল।

এই যে মেয়েটা নিরন্তর অবান্তর কথা বলছিল ছেলেটাকে হেয় করে যেটা হয়ত কিছুটা অ্যবিউসিভ। হয়ত মেয়েটার সাথে এমন আচরণ কেউ করে, তার বাবা মা বা ভাই বোন কেউ। এর ফলে যে মানসিক চাপ ও নেতিবাচকতা তৈরী হয় তার মনে, সেটা মানুষকে হীনমন্যতা বা নিয়ন্ত্রণহীনতায় ভোগায় সেটা দুর করতেই তার হয়ত কাউকে তার এই মধুর অ্যাবিউজটুকু করা প্রয়োজন। হয়ত তার বোন, বান্ধবী বা পরিবারের কেউ তার এইরকম কথা আর শোনে না, হয়ত তাদের বিরক্ত লাগে। তারা তাকে চুপ করিয়ে দেয়। এটা তাই মাঝে মাঝে মেয়েটাকে করতে হবে তার মানসিক চাপের মুক্তি বা ভেন্টিং এর জন্য ও আবেগের আনন্দের জন্য যেটা তাকে সুস্থ ও উদ্যমী রাখবে। 

মেয়েটার এই রকম কথাগুলো শুধু সে-ই শুনবে ও সহ্য করবে মেয়েটাকে দেখে ও তার কাছাকাছি এসে যার পুরুষ হরমোন বা টেস্টোস্টেরন ক্রিয়া করতে শুরু করে। টেস্টোস্টেরন পুরুষের মধ্যে সেই উৎসাহ উদ্দীপনা এনে দেয় যাতে সে অবান্তর কথা শুধু কেন, অবান্তর কাজকর্মও সারা জীবন করে যেতে থাকে যতক্ষন সেটা নিঃসরিত হতে থাকে তার শরীরে।

লিখিত ইতিহাসের শুরু থেকেই মূলতঃ শুধুই আবেগপ্রবণ মেয়েদের একটি কমন রোগ ছিল যার নাম হিস্টিরিয়া। এতে আক্রান্ত মেয়েরা উদ্বেগে আক্রান্ত হত, শ্বাসকষ্ট হত, অচেতন হয়ে যেত, খাদ্য বা যৌন ইচ্ছা প্রকট হত বা একেবারে কমে যেত, অবসাদে আক্রান্ত হত ইত্যাদি। এখন থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে পর্যন্ত, সেই ধর্মীয় ও সামন্ততান্ত্রিক সময় থেকে মেয়েদের অনেকটা পুরুষ সামাজিকতা মুক্ত রাখা হত। 

শুধু তাই না, আবেগের আতিশয্য যে সকল নারীর আচরণে থাকত, কথায়, হাসিতে বা আচরণে তাদের নানা রকম শাসনের মধ্যে রাখা হত যাতে তারা সেগুলো প্রকাশ করতে না পারে। আবেগের এই জোরপূর্বক দমনেই মেয়েদেরকে এই হিস্টিরিয়াগ্রস্থ করত বলে মনে করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে মেয়েদের স্বাধীনতা যত বাড়তে থাকে হিস্টিরিয়া রোগটিও সমাজ থেকে উধাও হয়ে যেতে থাকে।

ছেলেমেয়েদের বয়ঃসন্ধীকালের শুরু থেকেই তাদের দেহে মনে সেক্স হরমোনগুলোর ক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। অবশ্যই এই হরমোনের একটি প্রধান কাজ যৌন কর্ম (sexual activity) ও প্রজননের জন্য দেহকে প্রস্তুত করা, কিন্তু সেটাই একমাত্র কাজ নয়। এর সাথে ছেলে মেয়েদের মানসিকভাবে পরিণত হওয়া, অর্থাৎ বাবা মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরী হওয়া, যেমন নিজের কর্ম ও সিদ্ধান্তের জন্য দায়িত্ব নেওয়া, ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রেরণা, উদ্যম, উৎসাহ, ভাষাগত দক্ষতা ও চিন্তাপ্রক্রিয়ার পরিণত হওয়া বা কগনিশন ইত্যাদির সম্পর্ক আছে। 

এই হরমোনের সাথে জড়িত তাদের আবেগ, মেজাজ, উচ্ছলতা, বিষন্নতা উদ্যম ও জীবনের প্রতি উৎসাহের। কিশোর কিশোরীদের দেহে মনে যৌন হরমোনের প্রভাবকে শুধুমাত্র যৌনকর্ম বা বিয়ে সংক্রান্ত দৃষ্টিতে দেখা শুধু হীন মানসিকতার পরিচয় নয় এটা অধিকার হরণের অপরাধ। তাদের আবেগ প্রকাশের জন্য সমাজকে সুযোগ তৈরী করে দিতে হবে, নইলে বাড়বে মানসিক অসুস্থতা, সমাজের অসুস্থতা ও অপরাধ প্রবণতা। এই অসুস্থতা জমতে জমতে একসময় ফেটে পড়তে পারে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আসমান কাঁপানো অযৌক্তিক আক্রোশে যেটা একধরণের গণ বা মাস হিস্টিরিয়ার প্রকাশ।

 

JadeWits Technologies Limited
সর্বশেষপঠিতনির্বাচিত

আমরা আমাদের সেবা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করি। আমাদের কুকি নীতির শর্তাবলী জানার জন্য অনুগ্রহ করে এখানে ক্লিক করুন। কুকি ব্যবহারের জন্য আপনি সম্মত হলে, 'সম্মতি দিন' বাটনে ক্লিক করুন।