শেখ হাসিনা-আওয়ামী সরকার নিয়ে প্রথম আলো শিবিরের একটি ন্যারেটিভ ভাইরাল হয়েছে। সেটা হল আপনি বাসে করে কোথাও যাচ্ছেন। বাসে আগুন লেগেছে। তখন নাকি বাসটি কোথায় আছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আপনাকে নাকি নেমে পড়তে হবে। এখন চিন্তা করুন আপনি বাসে নয়, বিমানে আছেন। বিমানের দরোজা আপনার সিটের পাশেই। কিভাবে দরোজা খুলতে হবে আপনি ম্যনুয়াল পড়ে শিখে নিয়েছেন। ক্যাপ্টেন ঘোষণা করল বিমানের ডানদিকের ইঞ্জিনে আগুন লেগেছে।
অথবা ধরুন একটি কল্পনার বাস সপ্তম বেহেশত পার হয়ে অস্টম বেহেশতে যাচ্ছ, মাঝে আছে হাবিয়া দোজখ। আপনাদের বাসটা যখন হাবিয়া দোজখ পর হচ্ছে, অনেক তাপ। বাসের কোথাও কোথাও ধোঁয়া ও আগুন দেখা দিল। আপনি ৭২ হুরি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ তাপ ও আগুন দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। বাসের বেহেশতি সুপারভাইজার বলল সমস্যা নাই। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি বিশ্বাস করলেন না। ভাবলেন বাসে আগুন লেগেছে। আপনি নেমে গেলেন হাবিয়া দোজখে।
পরিস্থিতির সামগ্রিক ও দীর্ঘকালীন ঐতিহাসিক বিচার নয়, শুধুমাত্র কিছু ভিজ্যুয়াল কিউ এবং আবেগগত প্রভাব থেকে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত বা মানসিকতা তৈরিকে বলে চিন্তাপ্রক্রিয়াগত দারিদ্র্য (Cognitive Poverty)।
চিন্তাপ্রক্রিয়াগত দারিদ্র্য হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে ব্যক্তির চিন্তা-সম্বন্ধীয় ক্ষমতা—যেমন মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা এবং যুক্তিবোধ—দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য, মানসিক চাপ, আর্থিক উদ্বেগ বা সামাজিক অভাবের কারণে হ্রাস পায়।
এটি বুদ্ধিমত্তা (IQ) এর অভাব নয়, বরং পরিবেশ ও পরিস্থিতি দ্বারা সৃষ্ট (situational) সাংজ্ঞাত্মক সীমাবদ্ধতা। সংক্ষেপে, চিন্তাপ্রক্রিয়াগত দারিদ্র্য মানে বুদ্ধির কমতি নয়—এটি মানসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা দ্বারা সৃষ্ট হয়।
এই ধারণা রাজনীতি ও সামরিক কৌশলের প্রেক্ষাপটে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সাংজ্ঞাত্মক যুদ্ধ এবং মানসিক পরিচালনা ব্যবহৃত হয় জনগণের ধারণা ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে।
চিন্তাপ্রক্রিয়াগত দারিদ্র্য একটি পরিস্থিতিগত অবস্থা, যা দারিদ্র্য, মানসিক চাপ এবং সামাজিক অবহেলার ফলে মানুষের চিন্তাশক্তি ও যুক্তিবোধে প্রভাব ফেলে। এটি বুদ্ধির স্বাভাবিক অভাব নয়, বরং পরিবেশজনিত চাপ যা মনোযোগ, স্মৃতি এবং পরিকল্পনার ক্ষমতাকে হ্রাস করে। উদাহরণস্বরূপ, দারিদ্র্যজনিত চিন্তা একটি চিন্তাপ্রক্রিয়াগত বাধা (কগনিটিভ বার্ডেন) তৈরি করে, যা মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধানে অক্ষম করে তোলে।
বিভিন্ন গবেষণা এর তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছে, যেমন:
অভাব তত্ত্ব (Scarcity Theory)। অভাব মানুষের মনোযোগকে ক্ষুদ্র সমস্যার দিকে কেন্দ্রীভূত করে এবং জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
দীর্ঘস্থায়ী চিন্তাগত চাপ ও উদ্বেগ মস্তিষ্কের চিন্তাগত বা এক্সিকিউটিভ ফাংশনকে অতিরিক্ত ব্যবহারে বাধ্য করে, ফলে রিফ্লেকটিভ চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং পূর্বপরিকল্পনা কঠিন হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন গবেষণায় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেমন:
দারিদ্র ও চিন্তাপ্রক্রিয়া (Poverty & Cognition, Mani et al., 2013): দারিদ্র্য স্মৃতি ও মনোযোগ হ্রাস করে, যা এক রাত জেগে থাকার মতো প্রভাব ফেলতে পারে। দারিদ্র্যের সেই কারণে একটি চিন্তাপ্রক্রিয়াগত বাধা (কগনিটিভ বার্ডেন)।
ঘরোয়া উদ্দীপনা ও পুষ্টিহীনতার অভাব শিশুদের চিন্তা ও ভাষাগত সক্ষমতা পিছিয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় নিয়ে বার বার করা (Longitudinal) গবেষণা দেখায়, শৈশবে এই চিন্তাপ্রক্রিয়াগত ত্রুটি দীর্ঘমেয়াদে চিন্তাপ্রক্রিয়াগত দারিদ্র্য রূপ নিতে পারে।
কম চিন্তাপ্রক্রিয়াগত বিস্তার (cognitive bandwidth) থাকলে মানুষ জটিল যুক্তির পরিবর্তে আবেগভিত্তিক বার্তা গ্রহণ করে, যা জনপ্রিয় (populist) রিটোরিক ও মেরূকরণে (polarization) উৎসাহ দেয়।
চিন্তাপ্রক্রিয়াগত চাপ (Cognitive load) বৃদ্ধি তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে ব্যর্থ করে, ফলে আবেগগত (emotional) বা পরিচিত (আকাঙ্খীত) বার্তা গ্রহণে সহজে ভুল তথ্যের শিকার হয়।
আধুনিক যুদ্ধ, নরম যুদ্ধ ও ভূরাজনীতিতে মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন (সাইকোলজিক্যাল অপারেশনস, PSYOPS) পরিচালনায় চিন্তাপ্রক্রিয়াগত দারিদ্র যাদের আছে তাদের ধারণা, বিশ্বাস ও আচরণ পরিবর্তনের লক্ষ্যে মনকে অতিরিক্ত প্রভাবিত করে।
চিন্তুাপ্রক্রিয়াগত যুদ্ধ (Cognitive Warfare) কেবল মানুষ কী ভাববে তা নয়, কীভাবে ভাববে সেটা নিয়ন্ত্রণে আনে। মানুষের মনোযোগ, বিচারক্ষমতা, বায়াস এবং ও চিন্তাপ্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতাকে তারা ব্যবহার করে। আধুনিক যুদ্ধে কগনিশন নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত, যেখানে ইন্দ্রিয় সংবেদনশীলতার উপর চাপ (sensory overload), অবিশ্বাস তৈরির প্ররোচনা (distrust induction), মনোযোগ সংকীর্ণকরণ (attention tunnelling) এবং চিন্তাগত পক্ষপাতের অপপ্রয়োগ (cognitive bias exploitation) ব্যবহৃত হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্বে (২০২২-বর্তমান) এই কৌশলগুলো জনগণের মনোভাব পরিবর্তনে ব্যবহৃত হয়েছে (Smith, 2023)।
মানসিক চাপ ও চিন্তাপ্রক্রিয়াগত স্বল্পতা (cognitive scarcity) জনগণকে প্রভাবিত করা সহজ করে। দীর্ঘ ও বিস্তৃত ক্ষেত্র নিয়ে যুক্তিবোধের পরিবর্তে সীমিত পরিসরে যুক্তি প্রয়োগ ও প্রতিরোধহীনতা বাড়ায়।
চিন্তাপ্রক্রিয়াগত দারিদ্র্য একটি জটিল মানসিক ও সামাজিক বাস্তবতা, যা মানুষকে সিদ্ধান্তে দুর্বল করে, প্রভাব বিচ্যুত করতে সহজ করে এবং রাজনৈতিক ও সামরিক পটভূমিতে কলঙ্কিত করে। এটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি মানসিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, যার গুরুত্ব আধুনিক সমাজ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষা, মিডিয়া সাক্ষরতা এবং মানসিক সচেতনতা বাড়িয়ে এই দারিদ্র্য মোকাবিলা করা সম্ভব।
বাসে আগুন লাগলে তাই আগে চিন্তা করে দেখতে হবে যে বাইরের আগুনে বাস উত্তপ্ত নাকি সত্যিই বাসে আগুন লেগেছে। সেটা না হলে হাবিয়া দোজখে নেমে পড়বেন বাসে আগুন লেগেছে এই হুজুগ তুলে।
সূত্র:
১. Mani et al. (2013). Science.
২. Mullainathan & Shafir (2013). Scarcity.
৩. Kahneman (2011). Thinking, Fast and Slow.
৪. Diamond (2013). Annual Review of Psychology.
৫. NATO ACT / Allied Defense Symposium Reports.
৬. Smith, J. (2023). Cognitive Warfare in Modern Conflicts. Journal of Strategic Studies, 46(3), 123-145.
৭. Jones, R., & Patel, K. (2024). The Psychology of Cognitive Poverty: Implications for Political Manipulation. Political Psychology Review, 15(2), 89-104.
৮. NATO Strategic Communications Centre of Excellence. (2023).
© সিরাজুল হোসেন
