এপস্টিন ক্লাবের যারা সদস্য এবং বাংলাদেশের যারা জুলাই দাঙ্গার সমর্থক — এদের সবার কমন চরিত্র হচ্ছে এরা মানসিকভাবে ট্রমাগ্রস্ত। নির্যাতন থেকে উৎপন্ন অনিষ্পন্ন বা আনরিজলভড ট্রমা মানুষকে প্রতিক্রিয়াশীল এবং নির্যাতনকারীতে পরিণত করে, যারা অন্যের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশকে ঈর্ষা করে এবং চেতনে–অবচেতনে সেটাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়।
খন্দকার মুশতাককে শেখ মুজিব বলতেন তাঁর "প্রতিক্রিয়াশীল মন্ত্রী"। এই যে বর্তমানের জামায়াত, শিবির এবং বিএনপির বেশিরভাগই প্রতিক্রিয়াশীল। জুলাই দাঙ্গার সক্রিয় সবাই প্রতিক্রিয়াশীল। উদ্যোগীরা সৃজন করে সৃষ্টি করে, প্রতিক্রিয়াশীলেরা ধ্বংস করে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল ইসরায়েল ও পাকিস্তান।
নাৎসীদের অত্যাচারের ট্রমায় ইসরায়েলীরা প্রতিক্রিয়াশীল, যারা এখন ফিলিস্তিনিদের ওপর সেই নিপীড়ণই করছে—হিটলারের জার্মানি তাদের ওপর যে নির্যাতন চালিয়েছিল। ভারত থেকে ভাগ হওয়া পাকিস্তান ভারতের ভয়ে এতটাই ট্রমাগ্রস্ত যে তারা একাত্তরে বাঙালিদের ওপর সেই প্রতিশোধ তুলেছে।
বাংলাদেশ ৭১-এর ট্রমায় আবদ্ধ থাকেনি, তারা এটাকে নিষ্পন্ন করে বিজয়ের গর্বে পরিণত করেছে। অথচ পাকিস্তানের ভারত-ট্রমার সাথে বাংলাদেশ-ট্রমা যুক্ত হয়েছে। তাদের সাথে মিলেছে আমাদের মোল্লা মিলিটারি, যে ট্রমার বেশিরভাগ এসেছে মাদ্রাসায় নির্যাতিত হয়ে ট্রমাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে।
অনিষ্পন্ন মানসিক ট্রমা থেকে দুটো ঘটনা ঘটে। একটা হল ট্রমা বন্ড এবং আর একটা হল ট্রমা নির্ভর অ্যাসোসিয়েশন। ট্রমা বন্ড হল যে নির্যাতন করেছে তার প্রতি আকর্ষণ এবং তাকে মান্য করা। ট্রমা অ্যাসোসিয়েশন হল দুই বা ততোধিক মানসিক ট্রমাগ্রস্ত ব্যক্তির পরস্পরের মধ্যে একটি প্রতিশোধমূলক অ্যাসোসিয়েশন বা সংঘ তৈরি, যেটা একপ্রকার রেপটিলিয়ান বন্ধন। যারা প্রতিশোধের জন্য একত্মতা অনুভব করে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যমের চরিত্র সেইরকম।
বর্তমানে প্রেম–ভালোবাসায় যে দ্রুত একটা ক্র্যাশ তৈরি হয়, সেটা আসলে ট্রমা নির্ভর অ্যাসোসিয়েশন। যার অর্থ তারা উভয়ে একই রকম নির্যাতনে ট্রমাগ্রস্ত, তাই একে অপরকে খুব ভালো বুঝতে পারে বলে মনে করে এবং একই রকম প্রতিক্রিয়াশীলতায় আনন্দ পায়।
আমার বিশ্লেষণে এপস্টিন ঘটনার পুরো নেটওয়ার্কটাই আসলে নির্যাতন, ট্রমা, ট্রমা বন্ড এবং ট্রমা নির্ভর অ্যাসোসিয়েশন ভিত্তিক। বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর যে বন্ধন, সেটাও কিন্তু ট্রমা বন্ড (সেনা-কমান্ডার) এবং ট্রমা নির্ভর অ্যাসোসিয়েশন (সেনা-সেনা) ভিত্তিক।
মানসিক ট্রমার জন্য কাউকে যে নির্যাতিত হতেই হবে এমন নয়। যে সকল শিশু কোনো ধরনের বাধা, বিপত্তি অথবা বাস্তবতার কঠিন ছোঁয়া ছাড়া বড় হচ্ছে, তারা বয়সে পরিণত হলেও মানসিকতায় শিশু থেকে যায়। তখন তারা জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা দেখে ট্রমাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক সময় আমার অনেক বিদেশি বন্ধু–বান্ধবী ছিল। প্রতি কোরবানির ঈদে তারা যেন পশু জবাই এবং রক্ত দেখে মূর্ছা যেত। অথচ বিফ স্টেক বা চিকেন রোস্ট ছিল সবার পছন্দের খাবার। অর্থাৎ তারা খাবারের জন্য হত্যা করতে হবে—এটা দেখেই ট্রমাগ্রস্ত হয়ে যেত, যেটা মানব সমাজের প্রাকৃতিক নিষ্ঠুরতা। রাষ্ট্রদ্রোহীদের দমন করতে হবে এটাও কিন্তু শাসন প্রক্রিয়ার ঐতিহাসিক নিষ্ঠুরতা।
© সিরাজুল হোসেন
