EN
আরও পড়ুন
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
অপারেটর, অগ্নিনির্বাপক কর্মী, স্থানান্তরিত এবং বেঁচে যাওয়া মানুষদের গল্প — বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনায় আটকে পড়া মানুষদের কাহিনি
রাজনীতি
শয়তানবাদীদের খোলামেলাভাবে আন্তর্জাতিক আইন, প্রথা এবং জাতিসংঘের চুক্তি অবজ্ঞা
রাজনীতি
মার্কিন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার প্রভাবে
JadeWits Technologies Limited

মুখে জয় বাংলা হাতে ছুরি

আওয়ামী ফ্রেনেমিরা

অনেক সময় খুব ছোট ঘটনাও আপনাকে বাকি জীবনের জন্য বড় কোনো শিক্ষা দেয়। সেই শিক্ষা কোনো উপন্যাসের একটি প্যারাগ্রাফ, কোনো সিনেমার একটি দৃশ্য অথবা ফেসবুকে কোনো বন্ধুর একটি মন্তব্য থেকেও আসতে পারে, যদি আপনি নিজের প্রতি যত্নশীল হন।

ছোটবেলা থেকেই আমরা সমমনা মানুষ খুঁজি বন্ধু বা রোমান্টিক সম্পর্ক তৈরির জন্য। এটি করতে গিয়ে অনেক সময়ই আমরা সম নেশা বা সম আচরণের মানুষের কথা ভেবে থাকি। যেমন অনেকেই আছে, যাদের বাড়িতে মন টেকে না। তারা সুযোগ পেলেই অবান্তর ঘোরাঘুরিতে বেরিয়ে পড়ে। তারা ভাবে, এমনই অবান্তর ঘোরাঘুরি করতে চায়—এমন কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেলে খুব ভালো হতো। তারপর তারা বিয়ে করে সংসার পাতে, যেখানে সংসার মানে হলো বাড়িতে সন্তানদের জন্য জীবন বিলিয়ে আনন্দ পাওয়া।

এই বিষয়ে একটি দারুণ দৃশ্য আছে, যেখানে রাতের আকাশের ছবি তোলার শখ হলো ফরাসি তরুণী ফ্রাসোঁয়ার (ভার্জিনি লোডোয়েন)। তরুণ রিচার্ড (লিওনার্দো ডি’ক্যাপ্রিও) তার প্রতি আকৃষ্ট। ফ্রাসোঁয়ার রাতের আকাশের ছবি তোলার শখ দেখে সে তার প্রতি কল্পনার জাল বোনে, মহাকাশের রোমান্টিকতা মিলিয়ে। ফ্রাসোঁয়া তার রোমান্টিকতা শুরুতেই ভেঙে দেয় নিষ্ঠুর সত্য বলে। রিচার্ড তখন বাস্তবতায় ফেরে এই ভেবে যে, তাই তো—রাতবিরাতে জেগে জেগে আকাশের ছবি তোলা যে কোনো যুগলের জন্য বিচ্ছেদের প্রথম কারণ হবে।

বহু আগে আমি ফেসবুকে মজা করে একটি পোস্ট করেছিলাম আমার বন্ধুদের নিয়ে, যে তাদের অনেকেই অপেক্ষা করে আছে—কবে আমি মারা যাব, আর তারা আমার ক্যামেরা ও লেন্সগুলো পাবে। সেই পোস্টে আমার এক অস্ট্রেলীয় বান্ধবী মন্তব্য করে, ওরা তোমার বন্ধু বা ফ্রেন্ড নয়, ওরা ‘ফ্রেনেমি’।

আস্তে আস্তে আমার কাছে পরিষ্কার হয়—আমার বন্ধু বলে যারা পরিচয় দেয়, তাদের অনেকেই আসলে আমার বন্ধু নয়; তারা আমার ফ্রেনেমি। আসলে আমার মতো যারা, যারা কোনো বিষয়ে নিজের স্কুল-বন্ধু, পরিবার বা পাড়ার বন্ধুদের ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে যায় দক্ষতায় বা চিন্তায়—তখন অনেকে এসে বন্ধুত্ব পাতায়, আমার সেই উৎকর্ষতায় মোহিত হয়ে। তারা মনে করে, আমার সঙ্গে মিশে তারা আমার মতোই দক্ষ হওয়ার পথ পাবে। এই পর্যন্ত বিষয়টা শুভ। কিন্তু এটা ফ্রেনেমির সামনের সাদা অংশ মাত্র। ফ্রেনেমির বাকি অর্ধেক কালো। যখন তারা দেখে সেটা সম্ভব নয়, তখন তারা বন্ধুত্বের হাত ঘাড়ে রেখে অপর হাতে পিঠে ছুরি বসায়। এর কারণ হলো, তারা ভালোবাসা থেকে বন্ধুত্ব করতে আসেনি; এসেছে ঈর্ষা থেকে, আমার মতো হওয়ার জন্য।

ফ্রেনেমি শব্দটি ইংরেজি শব্দ “ফ্রেন্ড” বা বন্ধু এবং “এনিমি” বা শত্রুর সংমিশ্রণে গঠিত একটি যুক্ত শব্দ বা পোর্টম্যান্টো। এটি এমন একটি সম্পর্ককে বোঝায়, যেখানে একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাহ্যিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করে, কিন্তু অন্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ঈর্ষা বা অবিশ্বাসের অনুভূতি লুকিয়ে থাকে। এই ধারণাটি ব্যক্তিগত, ভূ-রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

ফ্রেনেমি শব্দটির প্রথম ব্যবহার ১৯৫৩ সালে দেখা যায়, যখন আমেরিকান গসিপ কলামিস্ট ওয়াল্টার উইঞ্চেল এটি রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বর্ণনা করতে ব্যবহার করেন। তিনি এটিকে “ফ্রেনিমিজ” হিসেবে উল্লেখ করেন, যা বন্ধুত্ব এবং শত্রুতার মিশ্রণকে বোঝায়। পরবর্তীতে, ১৯৭৭ সালে জেসিকা মিটফোর্ডের একটি নিবন্ধে এই শব্দটি আবার প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি এটিকে একটি শিশুর দ্বারা উদ্ভাবিত শব্দ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই শব্দটি এখন জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করা হয়।

ফ্রেনেমি ধারণাটি পণ্ডিত সম্প্রদায়ে তুলনামূলকভাবে নতুন এবং এর গবেষণা সীমিত; তবে এটি সম্পর্কের গতিশীলতা এবং আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ অধ্যয়নের ক্ষেত্রে ক্রমশ স্বীকৃতি পাচ্ছে। জেনা আবেটজের নেতৃত্বে ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২৯টি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ফ্রেনেমি সম্পর্কের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। এই গবেষণায় ফ্রেনেমিকে এমন একটি সম্পর্ক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা প্রায়ই নেতিবাচক, পরিস্থিতিগত সংযোগ এবং পারস্পরিক সামাজিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে; বাহ্যিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হয়, কিন্তু এর মধ্যে প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা বা অবিশ্বাস থাকে।

এই গবেষণায় ফ্রেনেমির তিনটি মূল উপাদান চিহ্নিত করা হয়েছে। একে, প্রতিযোগিতার মনোভাব। ফ্রেনেমিদের মধ্যে কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব, যেখানে একজন অন্যজনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। দুই, ঈর্ষা। ফ্রেনেমি সম্পর্কে ঈর্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা কাজের সাফল্য, ব্যক্তিগত অর্জন বা জীবনযাত্রার প্রতি হতে পারে। তিন, অবিশ্বাস। ফ্রেনেমি সম্পর্কে মৌলিক অবিশ্বাস থাকে, যা সম্পর্কটিকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

এই গবেষণাটি দেখায় যে বন্ধুদের যে কোর ডায়নামিক্স, ফ্রেনেমি সেটার মিশ্র অনুভূতির সম্পর্ক নয়; বরং এটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের সম্পর্ক, যা নেতিবাচক আবেগ দ্বারা চালিত হয়। তবে, ফ্রেনেমি নিয়ে গবেষণা এখনও সীমিত এবং এটি প্রায়ই অ্যাম্বিভ্যালেন্ট সম্পর্কের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। এর ফলে কিছু পণ্ডিত এটিকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ধারণা হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত।

ফ্রেনেমি সম্পর্কের মধ্যেও সূক্ষ্ম প্রকারভেদ রয়েছে। ফ্রেনেমি সম্পর্ক বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেতে পারে। কিছু সাধারণ প্রকারের মধ্যে রয়েছে:

অনফিল্টার্ড/আন্ডারমাইনিং ফ্রেনেমি: এই ধরনের ফ্রেনেমি প্রায়ই বন্ধুকে অপমান করে, উপহাস করে বা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে, যা অনেক সময় সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ওভার-ইনভলভড ফ্রেনেমি: এরা বন্ধুর জীবনে অতিরিক্তভাবে জড়িত হয়, যেমন তাদের পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে অনুমতি ছাড়া যোগাযোগ করে।

প্রতিযোগী ফ্রেনেমি: এরা কর্মক্ষেত্রে বা অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে, কিন্তু গোপনে আসল উদ্দেশ্য থাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাকে পিছনে ফেলা।

অ্যাম্বিভ্যালেন্ট ফ্রেনেমি: এরা কখনও সহায়ক, কখনও স্বার্থপর বা প্রতিযোগী হয়ে ওঠে।

প্যাসিভ-অ্যাগ্রেসিভ ফ্রেনেমি: এরা পরোক্ষভাবে কটাক্ষ বা ব্যাকহ্যান্ডেড প্রশংসার মাধ্যমে নেতিবাচক আচরণ প্রকাশ করে।

মনোবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে, ফ্রেনেমি আসলে একটি উচ্চ এমপ্যাথির ব্যক্তির প্রতি নার্সিসিস্টিক, সাইকো-সোশিওপ্যাথিক বা বিশেষ করে প্যাসিভ-অ্যাগ্রেসিভ ব্যক্তির ইতিবাচক (নকল) ও নেতিবাচক (আসল) উভয় উপাদানে গঠিত একটি অ্যাম্বিভ্যালেন্ট বা পরস্পরবিরোধী সম্পর্ক।

যদিও ফ্রেনেমি একটি আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক নির্দেশ করে, তবে এটি পেশাগত ক্ষেত্র—যেমন সহকর্মীদের মধ্যে, বা সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক সংগঠনেও দেখা যায়। সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা বা সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনৈতিক আদর্শ থাকা সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের খ্যাতি বা রাজনৈতিক দলের সফলতার কারণে সেগুলো ফ্রেন্ড না হয়ে ফ্রেনেমি পরিবেষ্টিত হয়ে যেতে পারে। গত ২০২৪ সালের বিপর্যয়ের আগেই আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে জামাত-শিবির বা বিএনপি মানসিকতার মানুষের প্রবেশ এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগের অনলাইনে যে আন্তঃকলহ—সেগুলোর একটি বড় কারণ ফ্রেন্ডের চেয়ে বেশি ফ্রেনেমি পরিবেষ্টিত হয়ে যাওয়া।

সামনে লিখব, কীভাবে চিনবেন ও এড়িয়ে যাবেন ফ্রেনেমিদের ছুরির আঘাত।

© সিরাজুল হোসেন

JadeWits Technologies Limited
সর্বশেষপঠিতনির্বাচিত

আমরা আমাদের সেবা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করি। আমাদের কুকি নীতির শর্তাবলী জানার জন্য অনুগ্রহ করে এখানে ক্লিক করুন। কুকি ব্যবহারের জন্য আপনি সম্মত হলে, 'সম্মতি দিন' বাটনে ক্লিক করুন।