তারেক রহমানের মেয়ে পার্টি করছে, ডান্স করছে—এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। আমার জীবনে একসময় আমি প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এরকম পার্টি করেছি এই বাংলাদেশেই। হয় কোনো বিদেশি ক্লাবে, অথবা কোনো বন্ধুর বাসার ছাদে, অথবা কোনো বাসার লিভিং রুম বা টেরাসে। নব্বইয়ের দশকের শেষের আওয়ামী আমল থেকে ২০০৬-এর বিএনপি আমল পর্যন্ত গুলশান–বনানীতে আমরা নিয়মিতই পার্টি করেছি। পার্টিতে থাকত নানা বয়সের দেশি বিদেশী ছেলে-মেয়ে এবং বার, লাউড ডিজে মিউজিক ও পার্টি লাইটিং—সবই থাকত। গোপনে নয়, সবার সামনেই। উত্তরা বা খিলগাঁওয়ের মতো জায়গায় আমার অ্যাপার্টমেন্টে বিদেশি বান্ধবীরা আসত, থেকে যেত সপ্তাহ–মাস ধরে। কেউ হয়তো আসত কাজে, কেউ হয়তো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে। কত রাতে পার্টি করে মেয়ে বন্ধুর সাথে ভোরে বাসায় ফিরেছি—কেউ কখনও কোনো প্রশ্নও করেনি। ৭৫ থেকে ২০ বছর প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সেনাশাসনের পর ১৯৯৬ থেকে ২০০৬, এই দশ বছর ছিল লিবারেল বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশ হারাল কীভাবে?
২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ও আওয়ামী নেতাকর্মীদের হত্যাচেষ্টার মধ্য দিয়ে লিবারেল বাংলাদেশকে মৌলবাদীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যে পরিকল্পনার মূল ব্যক্তি এই জাইমা রহমানেরই পিতা। এ সময়ই আবির্ভাব হয় বাংলা ভাইয়ের তাণ্ডব। এর পর চলতে থাকে ৬৪ জেলায় সিরিজ বোমা হামলাসহ নানা প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি মৌলবাদীকরণের পদ্ধতিগত মার্কিন ফর্মুলা প্রয়োগ, সেগুলো, সরকারেরই, বিশেষ করে তারেক রহমানের হাওয়া ভবনের নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণেই।
এর পর আসে এক-এগারো। ২০০৭-৮ সালের এক-এগারোর সময় শুরু হয় লম্বা চুল রাখলেও রাস্তাঘাটে অস্ত্রধারীদের চড়-থাপ্পড়। উদযাপন কঠিন হয়ে যায় পহেলা বৈশাখের মতো খোলা মাঠের পারিবারিক উৎসবও। সুন্দরবনে রাস মেলায় গিয়ে তারা মুসলিম দর্শনার্থীদের হেনস্তা করা শুরু করে, এই বলে যে মুসলমান হয়ে হিন্দুদের মেলায় এসেছে কেন। চড়-থাপ্পড় মারা হয় ট্যুর অপারেটরদের সেখানে মুসলিমের নিয়ে যাওয়ার জন্য। কারফিউ জারি হয় যেন ইংরেজি নববর্ষের রাতে। মদের ওপর বসানো হয় ৬৩৩% কর, মদকে মাদক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের ছদ্মবেশে জাকার্তা মেথড বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চলে। অন্তত দশ লক্ষ পার্টি করা, পূজা দেখতে যাওয়া, পহেলা বৈশাখে যাওয়া মুক্তমনা বাঙালি সংস্কৃতির লিবারেল বাঙালি জাতীয়তাবাদের মানুষদের হত্যা করে বাকিদের ভীত করে রক্তগঙ্গা বইয়ে মোল্লা-মিলিটারি শাসন কায়েমের প্রচেষ্টা চলে। সেটা সফল হয় না ভারতের হস্তক্ষেপে। এই অপকর্মের নেতৃত্বে ছিল জামায়াত–বিএনপি এবং তাদের অনুসারী সেনা কর্মকর্তারা।
আমার মতে তরুণ বয়সে পার্টি করাই উপকারী। ঐ সময় খোলামেলা সব ধরনের মানুষের সাথে মিশে মানুষ বুঝতে শেখে, সামনে থাকলেও কোনটা আকর্ষণীয় হলেও ক্ষতিকর। ওই অভিজ্ঞতায় যে মানসিক শক্তি তৈরি হয়, সেটা মানুষের মধ্যে এমন আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলে যে তাকে আর সহজে প্রলুব্ধ করা যায় না।
আমার প্রশ্ন হলো, আজ আওয়ামী লীগের যারা জাইমা রহমানের সমালোচনা বা তাকে বিদ্রূপ করছেন, তারা আসলে কী বোঝাতে চাইছেন? ২০০৯-এর আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পর তারা কি ২০০৪-এর আগের সেই লিবারেল বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন? নাকি তারা সেই ৬৩৩% কর এবং মদকে মাদক করার উল্লাসেই মেতে উঠেছিল যে পাবলিককে ঠান্ডা করার অস্ত্র পাওয়া গেল? যে কোন নিরপরাধ মানুষকে গ্রেফতার করতে আর বেগ পেতে হবে না। বাসায় হামলা করে একটি খালি মদের বোতল পেলেই হল। আওয়ামী র্যাব, পুলিশদের যেন কাজই হয়ে গিয়েছিল মদের বোতল খোঁজা।
ছাত্রলীগও কি পিছিয়ে ছিল? মদ খেতে দেখলে, কোনো মেয়েসহ পার্কে বেড়াতে গেলে ছাত্রলীগ ছিল সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয়। তাদের কাবিননামা দেখাতে হতো। সেটা না হলে হয় পুলিশ ডাকা হতো, না হয় মেয়েটিকে নষ্ট মেয়ে আখ্যা দিয়ে হয়রানি করা হতো। অস্বীকার করতে পারবে ছাত্রলীগ?
২০০৪ থেকে আওয়ামী বিরোধীরা সমাজকে যে মৌলবাদীকরণ করেছে, ২০০৯-এর পর আওয়ামী লীগ যেন সেটা আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বিএনপি–জামায়াত যেটা করত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, আওয়ামী লীগের প্রায় সবাই সেটা করত অন্তর থেকে।
এসব কথা এই সময়ে লেখার ইচ্ছা ছিল না। লেখলাম একটি অল্পবয়সী মেয়েকে সুযোগ পেয়ে অপমান করার অন্যায় সহ্য করতে না পেরে। নিজেদের দিকে তাকান। আমাদের সবার পরিণতি হয় আমাদের কৃতকর্মের ফল অনুসারে। বহু আগে মুনি–ঋষিরা বলে গেছেন কর্মফলে নিয়তির কথা।
খ্রীষ্টের জন্মের ৮০০ বছর আগে যাজ্ঞবল্ক বলেছিলেন:
“মানুষ হিসাবে কেউ এমন কেউ তেমন,
সে যা করে বা তার আচার ব্যবহার যেমন, সে তেমনই হবে;
ভাল কাজ যারা করে তারা ভালই তো হবে, মন্দ কাজের লোক মন্দ;
শুদ্ধ ক্রিয়কলাপে সে হয় শুদ্ধ, অশুদ্ধ ক্রিয়কলাপে হয় অশুদ্ধ;
তোমার গভীর অন্তরের কামনা যা, তুমি তাই;
তোমার কামনা যা, তোমার ইচ্ছাও তাই;
তোমার ইচ্ছা যা, তেমনই তোমার কর্ম;
তোমার কর্ম যা, সেটাই তোমার নিয়তি।“
- বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৪.৪:৫-৬. [২৩]
© সিরাজুল হোসেন
