EN
আরও পড়ুন
রাজনীতি
মনে শুধু ঘৃণা আর আত্ম ঘৃণার প্রতিফলনে:
মানসিক সমৃদ্ধি ও সম্পর্ক
রাজনীতি
পলিটিক্যাল সিস্টেমস থিংকিং এর শিক্ষা
রাজনীতি
JadeWits Technologies Limited
রাজনীতি

আবেগপ্রবণ মানুষেদের রাষ্ট্রে

মিডিয়া: প্রতিশোধপরায়ণতার চতুর্থ স্তম্ভ

বিগত সরকারের দেশ শাসনের শেষের বছরগুলোতে শত শত ত্রুটি, ভুল সিদ্ধান্ত এবং গণবিরোধী দমনমূলক আচরণ ছিল। আমি সব সময় খোলামেলা সেই সব আচরণের প্রতিবাদ করেছি এবং সেই সব আচরণের পেছনে যে সামরিক মস্তিস্ক এবং সিভিল প্রশাসনকে সামরিকীকরণ দায়ী এটা আমি বহু লেখায় বলেছি। পুলিশকে যে ক্রমেই সামরিকীকরণ করা হয়েছে তার বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছি। বর্তমানে নানা ভুক্তভোগীর ভাষ্যে বিগত সরকারের বেশীরভাগ অপরাধের যে ঘটনা উঠে আসছে তার বেশীরভাগের জন্য দায়ী তারা করছেন ডিজিএফআই, RAB ও পুলিশের আইনবহির্ভূত কর্মকান্ডকে।

বিগত সরকারের সময় এইসব বিষয়ে পত্র পত্রিকাগুলো অনেকটাই নীরব ছিল। বরঞ্চ বহু আইন ও বিচার বহির্ভূত আটক ও ক্রসফায়ারের ঘটনাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাধুবাদ দেওয়া হয়েছে। মিডিয়াগুলোর সামাজিক মাধ্যমের পাতায় ক্রসফায়ারের প্রতিটি মৃত্যুর রিপোর্টে হাজার হাজার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আমরা দেখেছি যেগুলো এখনও বিদ্যমান। বহু মানুষকে মিডিয়াই অপরাধীকরণ বা ক্রিমিনালাইজ করেছে যার ফল হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। বাংলাদেশের মিডিয়া এবং তাদের পাঠকদের সিংহভাগ ছিল দলমত নির্বিশেষে আইন ও বিচার বহির্ভূত আটক ও হত্যার সমর্থক।

দুবাইতে ওয়ার্ল্ড গভর্নেন্স ফোরামে ইলন মাস্ককে প্রশ্ন করা হয়েছিল সারা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মকে পরামর্শ দিতে যে কিভাবে তারা ইলন মাস্ক হতে পারবে। ইলন মাস্ক একটু ভেবে বলেছিলনে আমি এটা চাই না। একজন ইলন মাস্ক হওয়া এত কষ্টের যে তেমন কারো না হওয়াই ভাল। একজন বিজ্ঞান বা প্রকৃতিবিজ্ঞানের ছাত্রের কাছে বিবর্তনের তত্ত্বের সত্যতা কোন খুশির খবর নয়। সে জানতে পারে যে এই পৃথিবীতে প্রাণীজগতের যে চরম দু:খ, কষ্ট, মৃত্যু বা পুরো প্রজাতীর বিলোপের মত ঘটনায় প্রকৃতি যে অন্যায় করে সেই অন্যায়ের পরম ন্যায় বিচার করা হয় না সেই প্রাণ সৃষ্টির শুরু থেকেই। বিবর্তন যে একটা অতি নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া এটা যে কোন প্রকৃতি বিজ্ঞানের ছাত্রের মন ভেঙে দেবে কারন সে নিজেও এই নিষ্ঠুরতার বাইরে নয়।

কিন্তু বর্তমানের বেশিরভাগ ধর্মীয় ব্যক্তিরা মনে করে যে ব্যক্তি বিবর্তনের তত্ত্ব সত্য বলে মনে করছে সে ঈশ্বকে অস্বীকার করার জন্যই সেটা করছে এবং তার উদ্দেশ্য অবাধ যৌনাচার, মদ্যপান ও শেষ বিচারকে অস্বীকার করা। যেহেতু উক্ত ধর্মীয় ব্যক্তিরা ধর্মীয় বিধীনিষেধের কারণে অবাধ যৌনাচার, মদ্যপান করতে পারেন না ও শেষ বিচারের ভয়ে থাকেন, তাই তারা মনে করেন যে যারা বিবর্তনের তত্ত্ব সত্য বলে মনে করছে, তারা আনন্দ ফুর্তির দুয়ার খুলে যাবার জন্যই সেটা করছে। মনোবিদ্যা মতে এই রকম আচরণকে বলে হিংসা থেকে সৃষ্ট প্রতিশোধপরায়ণ বা ভিন্ডিকেটিভ চিন্তা বা আচরণ।

বর্তমান সময়ে মিডিয়ার ভূমিকায় প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ ব্যাপকভাবে দেখা যায়। আমার মনে একটি প্রশ্ন হল মিডিয়ার এই প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ মিডিয়ার ব্যবসা বা লাভের সাথে কতটুকু সম্পৃক্ত। লাভের সাথে সম্পৃক্ত হলে সেটা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হবে।এবং সেটা সমাজ থেকে প্রতিশোধপরায়ণ ব্যক্তিদেরকে ছেঁকে তুলে নিজের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে। এবং এর ফলে যে সকল মানসিক সমস্যা বা পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের একটি লক্ষণ তীব্র প্রতিশোধপরায়ণতা, প্রতিষ্ঠানে সেই সব ব্যক্তিদের সংখ্যা বৃদ্ধি হবে।

প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকে সৃষ্ট প্রতিশোধপরায়ণতা (Vindication) হলো এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্যের দ্বারা সৃষ্ট বা অন্যের দ্বারা সৃষ্ট মনে করে কোন, ক্ষতি বা অসম্মানজনক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিশোধ নিতে চায়। প্রতিহিংসা মূলত একটি আবেগগত প্রতিক্রিয়া, যা হিংসা, অপরাধবোধ, ক্রোধ, অপমান, বা হতাশা থেকে উদ্ভূত হয়।

প্রতিশোধপরায়ণ আচরণ (Vindictive Behavior) হলো প্রতিহিংসার ভিত্তিতে গৃহীত পদক্ষেপ বা কর্মকাণ্ড, যার উদ্দেশ্য হলো পূর্বের কোনো বাস্তব বা কল্পিত ক্ষতি বা অপরাধের প্রতিশোধ নেওয়া। এই ধরনের আচরণ সাধারণত ধ্বংসাত্মক এবং ব্যক্তিগত বা সামাজিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

ক। প্রতিহিংসার কারণ

প্রতিহিংসার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে কিছু সাধারণ কারণ হলো:

১। ট্রমা বা আঘাত: যখন কেউ অন্যের দ্বারা শারীরিক, মানসিক বা সামাজিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন প্রতিশোধের মনোভাব জন্মাতে পারে।

২। অপমান বা অসম্মান: কোনো ব্যক্তির সম্মানহানি হলে বা অপমানিত হলে, সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে চাওয়া প্রতিহিংসার একটি সাধারণ কারণ।

৩। ক্ষমতাহীনতা: ক্ষমতাহীনতার অনুভূতি বা অবিচারের শিকার হলে, অনেক সময় প্রতিহিংসার মনোভাব জেগে ওঠে।

৪। হিংসা: হিংসাত্মক মনোভাব, যেমন অন্যের সাফল্য বা সুখ সহ্য করতে না পারা, প্রতিহিংসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

খ। প্রতিহিংসার প্রকারভেদ

প্রতিহিংসা বিভিন্ন ধরণের হতে পারে, যার মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য প্রকারভেদ হলো:

১। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা: ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা পরিস্থিতিতে উদ্ভূত প্রতিহিংসা, যেমন ব্যক্তিগত আঘাত, অপমান, বা প্রতারণার প্রতিশোধ।

২। সামাজিক প্রতিহিংসা: কোনো সামাজিক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা, যেমন জাতিগত বা ধর্মীয় সংঘাত।

৩। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা, যা সাধারণত ক্ষমতা বা প্রভাবের লড়াইয়ের ফল।

৪। সমসাময়িক মিডিয়াতে প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রচারমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব একটি পুরোনো বিষয়। অনেক সময় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা তাদের রাজনৈতিক সংযোগের ভিত্তিতে তারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়ে থাকে। এই পক্ষপাতিত্বমূলক প্রতিবেদন রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে আরও উস্কে দিতে পারে।

কোন কোন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও ব্যক্তিত্বজনিত ব্যাধি প্রতিহিংসাপূর্ণ মনোভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকে। নিচে কিছু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং ব্যক্তিত্বজনিত ব্যাধির কথা উল্লেখ করা হলো, যা প্রতিহিংসাপূর্ণ মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে:

১. নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (Narcissistic Personality Disorder)

এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদেরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এবং অন্যদের থেকে প্রশংসা ও সম্মান আশা করেন। যখন তারা প্রত্যাশিত সম্মান বা স্বীকৃতি পান না, তখন তারা প্রতিহিংসাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। এই ধরনের প্রতিহিংসাপূর্ণ মনোভাব মূলত আত্মমর্যাদা রক্ষার চেষ্টা হিসাবে দেখা যায়।

২. বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (Borderline Personality Disorder)

এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত আবেগগতভাবে অস্থির থাকেন এবং তাদের আত্মসম্মানবোধ ও মনোভাব দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। কোনো ব্যক্তি তাদের প্রতারণা করলে বা প্রত্যাশা পূরণ না করলে, তারা প্রতিশোধের মনোভাব পোষণ করতে পারেন।

৩. প্যারানয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (Paranoid Personality Disorder)

এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবসময় সন্দেহপ্রবণ থাকেন এবং মনে করেন যে অন্যরা তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। এই সন্দেহপ্রবণতা তাদের প্রতিহিংসাপূর্ণ মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে, কারণ তারা মনে করেন যে প্রতিহিংসা না নিলে অন্যরা তাদের ক্ষতি করবে।

৪. এন্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (Antisocial Personality Disorder)

এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত সামাজিক নিয়ম বা আইন মেনে চলতে চান না এবং অন্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল হন না। তারা সহজেই প্রতিহিংসাপূর্ণ আচরণ করতে পারেন বিশেষত যখন তারা মনে করেন যে অন্য কেউ তাদের কাজে প্রতিকূলতা সৃষ্টি করছে।

সাংবাদিকতা একটি উচ্চ চাপের পেশা যেখানে প্রতিযোগিতা, জনসাধারণের নজরদারি, এবং নিয়মিত সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত কিছু বৈশিষ্ট্য প্রতিহিংসাপূর্ণ মনোভাবকে উৎসাহিত করতে পারে:

১। প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ: সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সফল হতে হলে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হয়। এই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব কিছু মানুষের মধ্যে প্রতিহিংসাপূর্ণ আচরণের সৃষ্টি করতে পারে।

২। অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: সাংবাদিকরা সাধারণত সমাজের অবিচার, দুর্নীতি, এবং অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে থাকেন। যদিও এটি একটি ইতিবাচক দিক, তবে কেউ কেউ এই কাজের মাধ্যমে নিজেদের ব্যক্তিগত আক্রোশ বা প্রতিহিংসা প্রকাশ করতে পারেন।

৩। কঠোর সমালোচনা: সাংবাদিকদের কাজের প্রতি জনসাধারণের কঠোর সমালোচনা থাকে, যা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে এবং কিছু মানুষকে প্রতিহিংসাপূর্ণ করে তুলতে পারে।

চীনে টেক জায়ান্ট গুগলকে নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে যে গুগলের মত সার্চ ইঞ্জিনের যে অ্যলগরিদম সেটা এমনভাবে তৈরি যে বিজ্ঞাপনের অর্থ যে পথে বেশী আসবে সেটা নিজেকে সেই পথে পরিচালিত করে। আবার এটাও দেখা গেছে যে ঘৃণা ও জিঘাংসা বা প্রতিশোধপরায়ণ বিষয়গুলোতে মানুষ আগ্রহী হয়। মানুষের এই আচরণ যখন সার্চ ইঞ্জিনের অ্যলগরিদমের সাথে মেলে তখন সার্চ ইঞ্জিনের অ্যলগরিদমও ঘৃণা ও জিঘাংসা বা প্রতিশোধপরায়ণ বিষয়গুলোকে প্রমোট করতে থাকে। সামাজিক মাধ্যমেও এই বিষয়টি ঘটে থাকে একইভাবে।

আমাদের মিডিয়া যদি দেখে যে তাদের প্রতিশোধপরায়ণ খবর বা প্রতিবেদন অর্থ উপার্জনে বেশি সহায়ক। এবং এতে যদি দেখা যায় যে বিশেষ কিছু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, যেগুলো প্রতিহিংসাপূর্ণ মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে, তারা খুব জনপ্রিয় কনটেন্ট তৈরি করছে। তখন সেই আচরনগুত ত্রুটি যাদের রয়েছে তারা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। তখন প্রতিষ্ঠানটিই হয়ে যাবে প্রতিশোধপরায়ণতার কেন্দ্র। বলা হয়ে থাকে মিডিয়া রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই রকম আবেগপ্রবণ মানুষের একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভটি প্রতিশোধপরায়ণতা হয়ে গেলে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যত কি?

JadeWits Technologies Limited
সর্বশেষপঠিতনির্বাচিত

আমরা আমাদের সেবা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করি। আমাদের কুকি নীতির শর্তাবলী জানার জন্য অনুগ্রহ করে এখানে ক্লিক করুন। কুকি ব্যবহারের জন্য আপনি সম্মত হলে, 'সম্মতি দিন' বাটনে ক্লিক করুন।